বলিভিয়া এবং চিলিতে রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দের সফর

ভারত এবং ল্যাটিন আমেরিকার মধ্যে অনেক কিছুই অভিন্ন। আজ ভারতের প্রতি যদি বিশ্বের দৃষ্টিপাত হয়ে থাকে  তবে তার কৃতিত্ব বৃহৎ বিশ্ব শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান। ভারত এবং ল্যাটিন আমেরিকা ধীরে ধীরে পরিপক্ক অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে চলেছে। বহু বছরের অবহেলা এবং সীমিত সম্পর্কের পর ল্যাটিন আমেরিকান এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চল হবে ভারতের পরবর্তি বড় পদক্ষেপ। বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক বিনিময় তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষের উচ্চ পর্যায়ের সফর বিনিময় ভারত-ল্যাটিন আমেরিকার সম্পর্কে এক নতুন গতি এনে দিয়েছে।
আফ্রিকা, পূর্ব এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্কের অগ্রগতির পর ভারত এখন ল্যাটিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের প্রতি আলোকপাত করছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিনের বলিভিয়া এবং চিলি সফরকে উপলব্ধি এবং বিশ্লেষণ করতে হবে। ভারতের বিদেশ নীতির দিক থেকে ল্যাটিন আমেরিকা ক্রমশঃ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নতুন দিল্লী সর্বোচ্চ স্তরে  সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাল কাজ করছে। এই অঞ্চলে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার ফলে চীন অনেকাংশে উপকৃত হয়েছে। ভারতকেও চীনের পথ অনুসরণ করতে হবে।
ল্যাটিন আমেরিকায় রাষ্ট্রপতির সফর এখন আর আনুষ্ঠানিক নয়। এখন এই সব সফরে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়, সঙ্গে থাকে বড় বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা হয়, তাছাড়া প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈঠক হয়। গতবছর রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ সুরিনাম এবং কিউবা সফর করেন, উপরাষ্ট্রপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু সফর করেন গুয়েতেমালা, পানামা এবং পেরু।
দু’দেশীয় দক্ষিণ আমেরিকা সফরের প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ বলিভিয়া যান। বলিভিয়া কেবল লিথিয়াম এবং অন্যান্য শক্তি উৎস ও খনিজ পদার্থেই সমৃদ্ধ নয়, এই দেশ ল্যাটিন আমেরিকান এবং ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্র গোষ্ঠীর পৌরোহিত্যও করে।
ভারতীয় রাষ্ট্রপতির প্রথম এই সফরের উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ভূতত্ব এবং খনিজ সম্পদ ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য মৌ স্বাক্ষর। বলিভিয়া ভারতে লিথিয়াম কর্বনেট সরবরাহ করবে। উভয় দেশ লিথিয়াম ব্যাটারী ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ গড়ে তুলতে একমত হয়েছে। ভারত এবং বলিভিয়া হাইড্রোকার্বনেট অনুসন্ধান এবং বিকাশে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং বলিভিয়া থেকে ভারতে এল এন জি আমদানি ও গ্যাস পাইপলাইন পাতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।
দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৭০তম বর্ষে রাষ্ট্রপতি কোবিন্দের চিলি সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের দিশায় এক বড় পদক্ষেপ। ভারত যেমন মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশততম জন্ম বার্ষিকী উদযাপন করছে তেমনি চিলিও সাহিত্যে লাটিন আমেরিকার প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়িনী  মহিলা কবি গ্যাব্রিয়েলা মিস্ট্রালের ১৩০তম জন্ম বার্ষিকী উদযাপন করছে।
ভারতীয় রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ এবং চিলির রাষ্ট্রপতি সেবাস্তিয়ান পিনেরা ‘পুনগর্ঠিত বহুপাক্ষিকতাবাদ’ এর প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। উভয় দেশই রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সর্বাত্মক সংস্কারের পক্ষপাতি যাতে এই সংস্থাকে অধিক প্রতিনিধিত্বমূলক, দায়বদ্ধ, স্বচ্ছ সর্বাত্মক এবং প্রভাবশালী করে তোলা যায়।
সবকিছু উন্নতির দিশায় এগোচ্ছে। ভারতে লাটিন আমেরিকার রপ্তানি দশ শতাংশ বেড়েছে। গতবছর লাটিন আমেরিকায় ভারতীয় রপ্তানি বেড়েছে ১০.৯ শতাংশ। তবে প্রতিরক্ষা উৎপাদন, গবেষণা এবং উন্নয়ন অথবা যৌথ সামরিক মহড়ার ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে এই অঞ্চলের সহযোগিতা সীমিত।
লাটিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দেশগুলি ভারতে তাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। এমনকি ছোটছোট দেশগুলিও তাদের মিশন খুলেছে। ভারতও এই অঞ্চলের সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পেরেছে। এই বাজারকে অবজ্ঞা করলে অনেক বড় ভুল হবে। সেই কারণেই ভারত লাটিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দেশগুলির সঙ্গে পারস্পরিকভাবে গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ হচ্ছে। লাটিন আমেরিকার ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। ভারত কোনোভাবেই ৬০০ মিলিয়ন জনসংখ্যা এবং প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জি ডি পি বিশিষ্ট  এই অঞ্চলের অপার সুযোগ হাতছাড়া করতে পারে না। (মুল রচনাঃ ড.অ্যাশ নারায়ণ রায়)

Comments