বিশ্বে ১০ কোটি মানুষ নিরন্ন, অনাহার ক্লিষ্ট
খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এখন বিশ্বব্যাপী একটি চ্যালেঞ্জ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস, ক্রমবর্ধমান ভূমিক্ষয়, ভূগর্ভস্থ জলস্তরে হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন-এই একাধিক কারণে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে, এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা ক্রমশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।
লক্ষ্য করার বিষয়, এক দিকে যখন উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ ও অধিক দক্ষ কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে সারা বিশ্বের সব মানুষের অন্ন সংস্থানের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে; অন্য দিকে দারিদ্র, অনাহার ও অপুষ্টির সমস্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ এক চরম বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি।
বিশ্ব খাদ্য সংকটের ওপর প্রকাশিত সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিশ্বে খাদ্য সমস্যা চরমে ওঠে; আর এর ফলে ৫৩ টি দেশের প্রায় ১২ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে তিন কোটির মত মানুষের সামনে খাদ্যের চরম অভাব দেখা দেয়। বিশ্বের ৮ টি দেশ- আফগানিস্তান, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ইথোপিয়া, নাইজিরিয়া, দক্ষিণ সুদান,সুদান সিরিয়া ও সাহেল’এ খাদ্য সংকট চরমে ওঠে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের নিরন্ন, অনাহারক্লিষ্ট মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বাস আফিকা মহাদেশে; যার মধ্যে পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলিতেই এই সংখ্যা বেশি। মধ্য প্রাচ্যের সাতটি দেশে এই সংখ্যা বিশ্বের অনাহারক্লিষ্ট মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশের মত। এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চারটি দেশ- বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও আফগানিস্তানে এই সংখ্যা প্রায় ১৩ শতাংশ। বাকি ৫ শতাংশ ইউক্রেন, ল্যাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। বিশ্বের নিরন্ন মানুষের সংখ্যার ওপর সমীক্ষা রিপোর্টটি গত সপ্তাহে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় সঙ্ঘ-EU, রাষ্ট্রসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংগঠন- FAO ও রাষ্ট্রসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি- WFP যৌথভাবে পেশ করে।
খাদ্য নিরাপত্তার অভাব জনিত সংকটের কারণ মূলত- ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, সামরিক সংঘর্ষ, ও শরণার্থী সংখ্যায় ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি। আবার এইসব কারণের মধ্যে প্রধানত অর্থনৈতিক সংকটের ফলেই বুরুন্ডি, সুদান ও জিম্বাবুয়ের মত দেশে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে খাদ্য সংকট ও অপুষ্টি সমস্যার মূল কারণ হবে সশস্ত্র সংঘর্ষ ও জীবন জীবিকায় নিরাপত্তার অভাব। এই সময়ে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ও ভূমিধ্বসের মত নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বের বহু অঞ্চলে কৃষি ও গবাদি পশুর উৎপাদন উদ্বেগজনক মাত্রায় হ্রাসের আশংকা রয়েছে।
এখন বড় প্রশ্ন হল- এই হতাশজনক পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার কোনও উপায় আছে কি? সমীক্ষা রিপোর্টে একটি অনাহারমুক্ত স্থিতিশীল বিশ্ব গঠনের পূর্বশর্ত হিসেবে একাধিক বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন- সংঘর্ষের অবসান, শান্তি, জীবন জীবিকার নিরাপত্তা, নারী ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক শিক্ষা ও পুষ্টি, গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন, ও একটি সার্বিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি।
বিশ্বে ক্রমবর্ধমান খাদ্য সংকটের প্রেক্ষিতে এই সংকট নিরসনের দিশায় উদ্ভাবনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। যাবতীয় উন্নয়নী ও মানবিক বিষয় সামনে রেখে আমাদের এই সংকট সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে।
রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-FAO’এর মহা নির্দেশক জস গ্রাজিয়ানো দ্য সিলভা এই প্রয়োজনের কথাই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, এই সব অভুক্ত, নিরন্ন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে ও তাদের জন্য পর্যাপ্ত জীবিকার সংস্থান করতে আন্তর্জাতিক স্তরে সকল দেশকে একযোগে অবিলম্বে এগিয়ে আসতে হবে। (কে ভি ভেংকটসুব্রামনিয়াম)
Comments
Post a Comment