ভারত-চীন সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসবার পর নতুন দিল্লির চীন সংক্রান্ত নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলেই অনুমান। এখন এই সম্পর্ক, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের পরিস্থিতিতে বিশ্ব রাজনীতিতে উতার চড়াও’এর প্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। ভারত ও চীন ২০১৭ সালে ডোকলাম অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার পর দুটি দেশের মধ্যে মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। এরই ফলশ্রুতি হিসেবে ২০১৮ সালে ইউহানে নরেন্দ্র মোদি এবং শি চিন ফিং-এর মধ্যে ঘরোয়া আলোচনাটির উল্লেখ করা যায়। ঐ আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল পারস্পরিক আস্থা গঠন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সেই থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একাধিক ইতিবাচক ঘটনাক্রম লক্ষ্য করা গেছে। চীন চার বার তার অসম্মতিসূচক ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করার পর শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী জয়েশ-এ-মহম্মদ’এর নেতা মাসুদ আজাহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসেবে ঘোষণা করল। শ্রী মোদি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর কিরগিস্তানের বিশকেক’এ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন-SCO শিখর সম্মেলনের পাশাপাশি এই প্রথম চীনা রাষ্ট্রপতি শি চিন ফিং’এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করলেন। দুই নেতা এ মাসের ২৮-২৯ তারিখে জাপানের ওসাকায় G-20 দেশগোষ্ঠীর সম্মেলন ছাড়াও ব্রাজিলে BRICS দেশগোষ্ঠীর সম্মেলন ও এ বছরের শেষের দিকে থাইল্যান্ডে চতুর্দশ পূর্ব এশিয়া শিখর সম্মেলনের অবসরে আবার বৈঠকে মিলিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ক্ষেত্রে অগ্রগতিকে সামনে রেখে দুই নেতা আবার এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হতে সম্মত হয়েছেন। এই বৈঠক হবে সম্ভবত আগামী ১১ই অক্টোবর বারাণসিতে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ও চীনা রাষ্ট্রপতিও শি চিন ফিং-এর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের কারণে দুজনের মধ্যে সম্পর্ক এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এর ফলে যে দ্বিপাক্ষিক মত পার্থক্যের সম্পূর্ণ নিরসন হয়েছে তা বলা যায় না। উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি সম্পন্ন SCO শিখর সম্মেলনের পর জারী করা যৌথ ঘোষণা পত্রে চীনের বেল্ট এন্ড রোড কর্মসূচীকে অনুমোদন দান থেকে ভারত দ্বিতীয়বার বিরত থাকলো। প্রকৃতপক্ষে ভারত হল একমাত্র দেশ যে বেল্ট এন্ড রোড আলোচনা মঞ্চ বয়কট করলো। অথচ নতুন দিল্লির অংশগ্রহণ ছাড়া পেইচিং-এর BRI কর্মসূচী সর্ব এশিয় প্রচেষ্টা হিসেবে সফল হবার সম্ভাবনা কম। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ভারত ও চীনের মধ্যে এখনও এক বড় ধরণের বিবাদমূলক বিষয়। এছাড়াও দুটি দেশের প্রতিনিধি পর্যায়ের বিশেষ বৈঠক ও বেশ কয়েক দফার আলোচনার পরেও অভিন্ন সীমান্ত প্রশ্নটির বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
পরমাণু উপকরণ সরবরাহ গোষ্ঠী বা NSG’তে চীন এখনও ভারতের সদস্য পদের বিরোধিতা করছে। চীন সম্পর্কে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হলেও কয়েকটি বিবাদমূলক বিষয়ে নতুন দিল্লির এক নিজস্ব অবস্থান রয়েছে। তবে দুই সরকারের উচ্চতম পর্যায়ে নিয়মিত আলাপ আলোচনার ফলে মতপার্থক্য বড় ধরণের কোন বিবাদের পর্যায়ে ওঠে নি। দুটি দেশ বৃহত্তর স্বার্থে পারস্পরিক সম্পর্কে ধারাবাহিক উন্নতি সাধন করছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসদমন ক্ষেত্রে দুই দেশেরই অভিন্ন স্বার্থ জড়িত।
এদিকে, চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যে নতুন দিল্লিকে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি বহন করতে হচ্ছে, ভারত যার একটি সন্তোষজনক সমাধান চাইছে। পাকিস্তানের গদর বন্দরের পরিকাঠামো বিকাশে চীনের সহায়তাও ভারতের কাছে এক উদ্বেগের বিষয়। প্রসঙ্গটি বারাণসিতে দুই নেতার মধ্যে ঘরোয়া আলোচনায় বিশেষ স্থান পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অন্যান্য যে সব বিষয় নিয়ে এই বৈঠকে আলোচনা হতে পারে সেগুলির মধ্যে আছে- BRI, চীন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য মত পার্থক্য এবং পারস্পরিক স্বার্থজড়িত অন্যান্য আঞ্চলিক বিষয়।
২০২০ সালে ভারত-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। এশিয়ার এই প্রধান দুটি দেশের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি প্রকৃতি নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। এই বন্ধুত্ব বিবাদমূলক বিষয়গুলির নিস্পত্তিতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান যোগাবে। (মূল রচনাঃ সানা হাশমি)
Comments
Post a Comment