আই সি জে’তে ভারতের কূটনৈতিক জয়

২০১৬র মার্চ মাসে ভারতীয় নাগরিকক কুলভূষণ যাদবকে চরবৃত্তি এবং সন্ত্রাসবাদের দায়ে পাকিস্তান আটক করে। ২০১৭র এপ্রিলে পাকিস্তানের একটি সামরিক আদালত তাকে মৃত্যু দন্ডের আদেশ দেয়। ২০১৭র মে মাসে ভারত হেগ-এ আন্তর্জাতিক আদালত আই সি জে’তে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ক’রে অভিযোগ করে যে তারা ১৯৬৩ সালের বাণিজ্য দূত সম্পর্ক সংক্রান্ত ভীয়েনা চুক্তির লঙ্ঘন করেছে। এই চুক্তির ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিনা বিলম্বে পাকিস্তানের উচিত ছিল কুলভূষণ যাদবকে আটক করা সম্পর্কে ভারতকে জানানো, কুলভূষণ যাদবকে তাঁর অধিকার সম্পর্কে জানানো এবং ভারতীয় বাণিজ্যিক দূতাবাসের আধিকারিকদের কুলভূষণ যাদবের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়া।

এই মামলায় আই সি জের শুনানীর সময় পাকিস্তান বিভিন্ন আইনী যুক্তি দেখিয়ে ভারতের দাবী খারিজ করে। ১৭ই জুলাই ২০১৯ আন্তর্জাতিক আদালত তাঁদের রায়ে বলেছে যে একজন ভারতীয় নাগরিক শ্রী কুলভূষণ সুধীর যাদবের আটক এবং বিচারের বিষয়ে পাকিস্তান ইস্লামিক সাধারণতন্ত্র বাণিজ্যদূত সম্পর্ক সংক্রান্ত ভীয়েনা চুক্তির ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত দায়দায়িত্ব পালন করে নি।

এই উল্লেখযোগ্য বিচারের রায়ে আন্তর্জাতিক আদালত সর্বসম্মতভাবে জানায় যে ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই ভীয়েনা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ সেই কারণে এই মামলা তাদের এক্তিয়ারভুক্ত। মামলাটিকে আর্বিট্রাল ট্রাইব্যুনাল অথবা কোনো আপোশরফা কমিশনে পাঠানোর পাকিস্তানী প্রয়াস আই সি জে খারিজ করে এবং বলে যে এই মামলাটি সরাসরি আই সি জে’তে উত্থাপনের অধিকার ভারতের আছে। গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে আটক কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভীয়েনা চুক্তি প্রযোজ্য নয় বলে পাকিস্তানের যুক্তি আই সি জে খারিজ করে দেয়। আদালত মনে করে কুলভূষণ যাদবকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ভারতকে না জানিয়ে, এবং ভারতের বাণিজ্য দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দিয়ে পাকিস্তান ভীয়েনা চুক্তির সংস্থান লঙ্ঘন করেছে।

ধারা ৬এ আই সি জে রায়ের মূল কথা অন্তর্নিহিত রয়েছে তাতে পাকিস্তানকে এই লঙ্ঘনের সুরাহা হিসেবে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বনের সুপারিশ করা হয়েছে। বাণিজ্য দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার সহ কুলভূষন যাদবের অধিকার অস্বীকার করার জন্য পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে অন্যায় কাজ করেছে বলে দোষারোপ করে আন্তর্জাতিক আদালত তাদের এই দুটি দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দিয়েছে। তারা অভিমত ব্যক্ত করেছে যে পাকিস্তানকে এই মামলার কার্যকরভাবে সমীক্ষা এবং পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সুবিচারের জন্য প্রয়োজন হলে পাকিস্তানকে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করতে হবে। ততদিন পর্যন্ত শ্রী যাদবের মৃত্যুদন্ডাদেশ স্থগিত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই রায়ের পর বলেছেন যে সত্য এবং ন্যয় বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঘটনাবলীর ব্যাপক অধ্যায়নের ভিত্তিতে এই রায় দেবার জন্য তিনি আই সি জে’কে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন আমি নিশ্চিত যে কুলভূষণ যাদব ন্যয় বিচার পাবেন। আমাদের সরকার সর্বদাই প্রত্যেক ভারতীয়র সুরক্ষা এবং কল্যাণের জন্য কাজ করে যাবে।

বিভিন্ন কারণে এই রায় তাৎপর্যপূর্ণ। আই সি জে নিয়মের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই মামলায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছে বিচারের এই রায় বাধ্যতামূলক। ভারত তার নাগরিকদের প্রতি ন্যয় বিচার সুনিশ্চিত করার এবং দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিবাদ নিস্পত্তির জন্য আইনের অনুশাসন মেনে চলার যে কথা বার বার বলে আসছে এটি তারই প্রতিফলন। বর্তমান বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা এবং আইনের অনুশাসনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নীতির এক অগ্নি পরীক্ষা এই রায়।

ব্যাপক পরিসরে আই সি জে’র রায় ১৯৪৭ সাল থেকে রাষ্ট্রসঙ্ঘ সনদের ১৩র ১ ধারায় বল প্রদানের ক্ষেত্রে ভারতের অব্যাহত প্রয়াসকেই তুলে ধরে। এতে আন্তর্জাতিক আইনের প্রগতিশীল উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এই মামলায় বাণিজ্য দূত সম্পর্ক সংক্রান্ত ভীয়েনা চুক্তির বিভিন্ন সংস্থানের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। (মূল রচনাঃ অশোক কুমার মুখার্জী)

Comments