জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের সামনে চ্যালেঞ্জগুলি

জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন একটা সময় যেমন সমগ্র বিশ্বের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিল এখন সেরকমটা না হলেও এই পরিস্থিতি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন আগামী সপ্তাহে আয়োজিত হতে চলেছে আজারবাইজানে। বিষয়টা এরকম নয় যে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। এর প্রতি উদাসীনতা হ'ল ক্ষমতায় বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের কারণে যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন নক্ষত্রের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বটি একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করছে - আটলান্টিক যুগের সমাপ্তি এবং এশীয় শতাব্দীর আবির্ভাব। প্রকৃতপক্ষে, জনৈক বিশেষক সদর্থেই একবিংশ শতককে গোষ্ঠীহীন বিশ্ব বা G-Zero world হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী সংস্থাগুলির বিস্তার দেখেছে। ‘জি-জিরো ওয়ার্ল্ড’-এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি হ'ল কোনও একক দেশ বা গোষ্ঠীকরণের সত্যিকারের আন্তর্জাতিক কার্যসূচী চালানোর জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লাভ নেই।

কয়েক বছর আগে, ভারতের শীর্ষস্থানীয় কৌশল বিশেষজ্ঞরা ‘জোটনিরপেক্ষ ২.০' নামে একটি নথি প্রকাশ করেছিলেন যাতে বলা হয়েছিল যে, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মূল তত্ত্বগুলি অনুসরণ করলে ভারত বিশ্ব মঞ্চে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে এবং তার কৌশলগত স্বসাশন এবং মূল্যবোধ সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী অধ্যায় শেষ এবং একটি নতুন যুগ — শীতল যুদ্ধ ২.O শুরু হয়েছে। এটি চরিত্রগত দিক থেকে আলাদা হলেও এটি ভয়প্রদর্শনকারী এবং এটি কেবল প্রতিযোগিতামূলক আগ্রহের ভিত্তিতে নয় প্রতিযোগিতামূলক মূল্যবোধগুলির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তাই জোট-নিরপেক্ষতাকে পুনরায় নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর এস জয়শঙ্কর ভারতের বৈদেশিক নীতিটির যে রূপরেখা দিয়েছেন তার মধ্যে ইস্যু-ভিত্তিক জোট, প্রধান শক্তিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা আরও বাড়ানো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংক্ষেপে এটি জোট নিরপেক্ষতারই সমর্থন। ভারত কোনো জোটেই সামিল হবে না।

জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনের কাছ থেকে প্রত্যাশা কখনও বেশি ছিল না। যে অঞ্চলে এটি সংঘটিত হচ্ছে তা কখনই নিরপেক্ষ বিশ্বের অংশ ছিল না, জি -২০ এবং ব্রিকসের মতো অন্যান্য বিশ্ব-মঞ্চগুলির কারণেই বিশ্বব্যাপী আলোচ্যসূচী নির্ধারণ করা শুরু হয়েছে যেখানে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জোট নিরপেক্ষ দেশগুল এক বৃহত্তম গোষ্ঠী হিসাবেই রয়ে গেছে। ভারত একটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ এবং এটি এখনও জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের মূল নীতিগুলির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যুদ্ধোত্তর বিশ্বে, ভারত, জোট নিরপেক্ষতায়, স্বাধীনতা অবশ্যই সব মানুষের মুক্তির সংগ্রামের অংশ হতে পারার বিষয়ে গান্ধীজীর প্রত্যাশার পূর্ণতা দেখেছে।

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন দীর্ঘকাল ধরে বৈদেশিক নীতি মতবাদ এবং একটি নির্দিষ্ট বৈদেশিক নীতি অভিমুখী ছিল। নতুন স্বাধীন দেশগুলি তাদের সার্বভৌম মর্যাদা রক্ষার জন্য জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগ দেয়। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন একটি ন্যায়সঙ্গত বিশ্বের কথা বলে। বেশ কয়েকটি সাধারণ সমস্যা এখনও বিদ্যমান। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের পুনর্নির্মাণের দরকার নেই; কিন্তু, প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য, এর এজেন্ডারগুলি পুনরায় যথাযথ করা এবং এর কাজকর্মকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

ভারত জোট-নিরপেক্ষতার লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভারত মনে করে, "জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন উন্নয়নশীল বিশ্বের সম্মিলিত স্বার্থের অনুসরণে ... বিশেষত বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার ও নিরস্ত্রীকরণের মতো বিষয়গুলিতে ... পদক্ষেপের জন্য প্রতিনিধিত্ব করে"।

রাষ্ট্রসঙ্ঘও এখন আর আগের মতো কার্যকরী নয়। তবুও কি কেউ রাষ্ট্র সঙ্ঘ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে? জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন একটি শক্তিশালী মঞ্চ যা রাষ্ট্র সঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী আসন প্রাপ্তির দাবি জানানোর ক্ষেত্রে ভারতের প্রয়োজন হবে। এর আরও একটি কারণ রয়েছে। আজ, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা নজর কেড়েছে। ভারত উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সহায়তার একটি বড় সাহায্যকারী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ব্যান্ডাং আদর্শে অনুপ্রাণিত - জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, সাম্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, পরিচয় এবং স্থানীয় বিষয়বস্তুই হলো দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার মূল বিষয় ।

আসন্ন বাকু সম্মেলনে দীর্ঘস্থায়ী বিকাশের জন্য ২০৩০ কর্মসূচী এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সন্ত্রাসবাদের প্রসঙ্গও সুস্পষ্টভাবে উঠে আসবে এই সম্মেলনে।

আজারবাইজান এই আন্দোলনের নেতৃত্বের অপেক্ষায় রয়েছে। এর নিজস্ব বৈদেশিক নীতিও যথেষ্ট শিক্ষামূলক। এটি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া এবং ন্যাটো উভয়ের সঙ্গেই অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা আজারবাইজানের অবশ্যই রয়েছে। কীভাবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা জোরদার করতে পারবে এবং জোট নিরপেক্ষ সদস্যদের মধ্যে আরও বেশি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করবে এই বাকু সম্মেলন ।

[মুল রচনা- ডক্টর আশ নারায়ন রায়]

Comments