কর্তারপুর করিডোর তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে

ভারত ও পাকিস্তান, দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা উপেক্ষা করে কর্তারপুর করিডোর তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিল। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের নারোওয়াল জেলায় অবস্থিত গুরদুয়ারা দরবার সাহিব দর্শনের সুবিধা করে দিতেই দুটি দেশের এই সিদ্ধান্ত। শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক দেব জি, এই গুরদুয়ারা দরবার সাহিব প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেই তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর শিখ ধর্মের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত থাকেন। এই দরবার সাহিব গুরদুয়ারাতেই গুরু নানক জি তিনি চির নিদ্রায় শায়িত। গুরু নানক জি’র ৫৫০ তম আবির্ভাব বার্ষিকী স্মরণে কর্তারপুর করিডোর আগামী মাসে তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার কথা। গত বছর নভেম্বর মাসে ভারত সরকার, ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরদাসপুর জেলা থেকে ভারত-পাক আন্তর্জাতিক সীমান্ত পর্যন্ত চার লেনের কর্তারপুর করিডোরের অংশ বিশেষ নির্মাণের সবুজ সঙ্কেত দেয়। এখান থেকে এই করিডোরের বাকি পথটি নির্মাণের দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের।

পাকিস্তানে শিখ ধর্মস্থলের সংখ্যা ১৭৩। তবে ১৯৭৪ সালে দুটি দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে এগুলির মধ্যে মাত্র কয়েকটি ধর্মস্থল পরিদর্শনেরই অনুমতি রয়েছে ভারতীয় শিখ তীর্থযাত্রীদের।

এ পর্যন্ত ভারতীয় শিখ তীর্থযাত্রীদের এই দরবার সাহিব গুরদুয়ারা স্থলে পৌঁছে এই ধর্মস্থল পরিদর্শনের সুযোগ ছিল না। তাঁরা ভারত-পাক সীমান্তে ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত ডেরা বাবা নানক গুরদুয়ারায় গিয়ে সেখানে স্থাপিত বায়নোকুলার ব্যবহার করে গুরদুয়ারা দরবার সাহিব দর্শন করতে পারতেন। এ ছাড়াও পাকিস্তান সরকার মাত্র বিশেষ চারটি সময়ে, যেমন বৈশাখী উৎসব, গুরু অর্জুন দেব জি’র শহীদ দিবস, মহারাজা রঞ্জিত সিং’এর প্রয়াণ বার্ষিকী ও গুরু নানক দেব জি’র আবির্ভাব বার্ষিকী উপলক্ষ্যেই সীমিত সংখ্যক ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের পাকিস্তানের শিখ ধর্মস্থল দর্শনের সুযোগ দিয়ে আসছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, ভারত থেকে শিখ তীর্থযাত্রীদের দরবার সাহিব গুরদুয়ারা দর্শনের সুযোগ দিতে এই ধর্মস্থলটির সঙ্গে সংযোগকারী একটি করিডোর নির্মাণের প্রস্তাব বহু দিনের। ১৯৯৯ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর ঐতিহাসিক লাহোর বাস যাত্রার সময়ে নতুন দিল্লি এই করিডোর নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। ইসলামাবাদ, সে দেশের শিখ সম্প্রদায়কে তাঁদের ধর্মস্থলগুলি পরিচালনার স্বায়ত্বশাসন দিতে ওই বছরেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাভিদ নাসিরের সভাপতিত্বে “পাকিস্তান গুরদুয়ারা প্রবন্ধক কমিটি” গঠন করে। তবে কার্যত এই কমিটি আদৌ স্বশাসিত নয়, কারণ এই কমিটিকে পাকিস্তানের একটি ভূ সম্পত্তি পর্ষদের অধীনেই কাজ করতে হয়।

কর্তারপুর করিডোর, গুরদুয়ারা দরবার সাহিব দর্শনের জন্য ভারতীয় শিখ তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পাকিস্তান, তার আগ্রহের কথা ঘোষণার পরেই এ বছর মার্চে আট্টারি সীমান্তে দুটি দেশের মধ্যে প্রথম বৈঠক হয় এ সংক্রান্ত বিধিনিয়ম রচনার জন্য। তবে দুটি বিষয়ে দু পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। পাকিস্তান, করিডোরটির রক্ষাণাবেক্ষণের যুক্তি দেখিয়ে যাত্রী পিছু ২০ ডলার ফি ধার্য্য করতে ইচ্ছুক বলে জানায়। অপরদিকে ভারতের বক্তব্য হল, এই ফি ধার্য করা হলে ভারত থেকে বহু গরীব মানুষ এই পবিত্র শিখ ধর্মস্থল- দর্শনে বঞ্চিত থাকবেন। এ ছাড়া ভারত, কূটনৈতিক আধিকারিকদের তীর্থযাত্রীদের সফর সঙ্গী হবার যে প্রস্তাব দেয়,তাতে পাক কর্তৃপক্ষ আপত্তি আছে বলে জানায়। ইসলামাবাদ অতীতেও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পাঞ্জা সাহিব ও নানকানা সাহিব গুরদুয়ারা সফরের সময় ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনের আধিকারিকদের দেখা করার অনুমতি দেয় নি।

দুটি দেশ তীর্থযাত্রীদের ভিসা ছাড়া সফরে সম্মত হয়েছে, তবে তাদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথি অন-লাইন থাকতে হবে। পাকিস্তান, বিশেষ কোনও উপলক্ষ্য ছাড়া প্রতিদিন সর্বাধিক ৫ হাজার তীর্থযাত্রীকে দর্শনের অনুমতি দিয়েছে, যদিও ভারত প্রতিদিন ১০ হাজার দর্শনার্থীকে অনুমতি দেবার আর্জি জানিয়েছিল। তবে একটা বিষয়ে নতুন দিল্লির উদ্বেগ রয়ে গেছে। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে ভারত বিরোধী শক্তি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে বলে ভারত আশংকা ব্যক্ত করেছে। পাক কর্তৃপক্ষ, কর্তারপুর আয়োজক কমিটিতে গোপাল সিং চাওলা নামে একজন ভারত বিরোধী ব্যক্তিকে নিযুক্ত করায় নতুন দিল্লির এই আশংকা যে ভিত্তিহীন নয় তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যাই হোক, কিছু কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ও এক ধরনের অনিশ্চয়তা থাকলেও কর্তারপুর করিডোর তীর্থযাত্রীদের জন্য খুলে দেবার সিদ্ধান্ত প্রকৃত অর্থে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। ভারত-পাক সম্পর্কে তিক্ততা থাকলেও এই করিডোর শান্তির করিডোর হিসেবে দুটি দেশের জনসাধারণের মধ্যে এক আত্মিক সেতু বন্ধনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেই প্রত্যাশা। (মূল রচনাঃ-ডঃ স্ম্রুতি এস পটনায়েক)

Comments