আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পর সেদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে মজবুত করার দিশায় আর একটি মাইল ফলক অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে। আফগানিস্তানের নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী বর্তমান রাষ্ট্রপতি আশরফ গণি ৫০.৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। শ্রী গণির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি প্রাক্তন বিদেশ মন্ত্রী ড. আবদুল্লা আবদুল্লা ২,০০,০০০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন।

তালিবানের হিংসার মুখে দাঁড়িয়ে এই দেশ অসামরিক শাসনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আফগানিস্তানের স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন নির্বচনে কারচুপি এড়াতে সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছে। এর ফলে, বায়োমেট্রিক পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার দরুণ হাজার হাজার ভোটদাতা অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন। তা সত্বেও নির্বাচন সংক্রান্ত অনেক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন সমস্ত অভিযোগ বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এই প্রক্রিয়া বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। পরিশেষে যদি শ্রী আসরফ গনী পঞ্চাশ শতাংশের কম ভোট পান তবে দুই জন প্রতিনিধির মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোট গ্রহন হবে। কিন্তু যেহেতু এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া তাই কোনো কায়েমী স্বার্থ যাতে রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তা সৃষ্টি করতে না পারে বা সেদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নেতীবাচক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে তা সুনিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অনেক নেতা পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টি রাখছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শ্রী আশরফ গণির নির্বাচনে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ঘনিষ্ট প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের প্রতিশ্রুতির কথা পুনরায় উল্লখে করে শ্রী মোদি বলেন আফগানিস্তান ঐক্যবদ্ধ, সার্বভৌমিক, গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধশালী এবং শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিরাজ করবে। শ্রী মোদি বলেন আফগানবাসীদের নেতৃত্বাধীন এবং আফগানবাসীদের নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানে শান্তি প্রক্রিয়াকে ভারত নীতিগতভাবে সমর্থন করে। শ্রী মোদি আরো উল্লেখ করেন যে আফগানিস্তানের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে, ভারত এই অঞ্চলের উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঘনিষ্টভাবে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে।

ভারত মনে করে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাফল্যের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পূর্ণ করা নিজেই এক বড় সাফল্য। ২০০১ সালে তালিবানের পতনের পর থেকে এটি আফগানিস্তানের চতুর্থ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তখন থেকে তালিবানরা পিছিয়ে পড়লেও এখনও তারা নির্মূল হয় নি। গতসপ্তাহে কাবুলে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হবার মাত্র কয়েক দিন পর উত্তরাঞ্চলীয় বাল্ক প্রদেশে তালিবানদের হাতে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্ততঃ ১৫জন প্রাণ হারান। প্রায় সেই সময়ই পশ্চিমাঞ্চলীয় ফারাহ প্রদেশে তারা ২৭জন শান্তি কর্মীকে অপহরণ করে।

এই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের জনগণ বন্দুকের শাসনের বিরুদ্ধে অসামরিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংগ্রাম করে চলেছে। আর সেই কারণেই নতুন দিল্লী প্রতিনিয়ত বলে আসছে যে আফগানিস্তানে তালিবানদের রক্তপাত বন্ধ করার নিশ্চিত পথ হল সেদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা। তবেই যুদ্ধ বিদ্ধস্ত এই দেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে এই দিশায় আরো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে দেখা যেতে পারে।

রাষ্ট্রপতি আসরফ গণি এবং ড.আবদুল্লা আবদুল্লা যদিও আফগানিস্তানের ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী-প্রধান নির্বাচন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্ব করেন তবে তারা ক্ষমতা বন্টন ব্যবস্থার সঙ্গে আগে থেকেই সুপরিচিত। তৃতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বচনের পর তারা এক সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব নির্বাহ করেন। ড.আবদুল্লা ভারতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রপতি গণি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, এবং তিনি আফগানিস্তানে বুদ্ধিজীবিদের অগ্রগণ্য বলে সুবিদিত। অতীতের মত এক সঙ্গে কাজ করতে তাদের অসুবিধার হবার কথা নয়। আফগানিস্তানের সামনে তালিবানরা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। সবার প্রথমে সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। (মূল রচনাঃ এম কে টিক্কু)

Comments