জগনাথের সফর ভারত মরিশাস সম্পর্ক মজবুত করবে

মরিশাসের পুনর্নিবাচিত প্রধানমন্ত্রী প্রভিন্দ জগনাথের গত সপ্তাহে ভারত সফরের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পরস্পরের দ্বিপাক্ষিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতি উভয় দেশ যে গভীর গুরুত্ব আরোপ করে তা উপলব্ধি করা যায়। মরিশাসের ১.৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশের বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভুত। দুটি দেশ তাদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং উন্নয়নী কাজকর্মের জন্য প্রকৃতিই পরস্পরের খুব কাছাকাছি।

যদিও নতুন দিল্লীতে সরকারী কূটনৈতিক মহলে প্রধানমন্ত্রী জগনাথের সফরকে বেসরকারী বলে বর্ণনা করা হচ্ছে; তবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে হায়দ্রাবাদ হাউসে অভ্যর্থনা জানান আর বিশিষ্ট অতিথিদের সরকারী বৈঠক স্থল হিসেবে এই হায়দ্রাবাদ হাউস সুনির্দিষ্ট রয়েছে। বৈঠকের সময় উভয় নেতা পরস্পরকে তাদের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ট করে তোলার আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে মরিশাসের আশা-আকাংখ্যার প্রতি ভারতের সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেন।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন মরিশাসের সরকার এবং জনগণ ভারতের আন্তরিক সমর্থনের প্রতি এবং মজবুত মরিশাস গড়ে তোলার বিষয়ে তাদের আশা আকাংখ্যার প্রতি ভারতের অব্যাহত একাত্মতার বিষয়ে সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী জগনাথ মেট্রো প্রকল্প, একটি বিশেষজ্ঞ ই এন টি হাসপাতাল, সামাজিক আবাসন প্রকল্প ইত্যাদির মত একাধিক উন্নয়নী এবং সহযোগিতা প্রকল্পের প্রতি ভারতের সমর্থনের প্রশংসা করেছেন। এই প্রকল্পগুলি মরিশাস জনগণের যথার্থ উপকার করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভারত ভারতীয় মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র মরিশাসের সঙ্গে সযত্নে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক লালন করে আসছে। এই দেশের নাগরিকগণ ভারতের সঙ্গে অব্যাহত মজবুত সম্পর্ক চায়।

প্রধানমন্ত্রী জগনাথ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেন যে মরিশাসের সার্বিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার প্রতি তাঁর নতুন সরকার অগ্রাধিকার প্রধান করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে ভারত এই প্রয়াসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাঁর পুনর্নিবাচনের পরেই প্রধানমন্ত্রী মোদি টেলিফোনে শ্রী জগনাথকে অভিনন্দন জানান এবং তাকে যথাশীঘ্র ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মিলিট্যান্ট সোস্যালিস্ট মুভমেন্ট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার একমাস পর প্রধানমন্ত্রী জগনাথ স্ত্রীকে নিয়ে ভারত সফরে আসেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রাভিন্দ জগনাথ মরিশাসের প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রী অনিরুধ জগনাথের পুত্র। শ্রী প্রভিন্দ জগনাথ দেশবাসীর উন্নতিকল্পে তাঁর পরম্পরা বয়ে নিয়ে চলেছেন। সে দেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ ভারতীয় বংশোদ্ভুত। তারা ব্রিটিশ সরকারকে সহায়তা করতে আঁখ চাষের কাজ করতে শ্রমিক হিসেবে প্রায় দুশো বছর আগে এদেশে আসে। আজ ভারতের সেই উত্তরপুরুষরা কৌশলগতভাবে অবস্থিত এই দেশের গর্বিত নাগরিক। এই দ্বীপ রাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্ত বড় শক্তিগুলি ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। মরিশাসের জনগন সর্বদাই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তা মজবুত করার প্রতি অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। সেই কারণেই তারা ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে যত্নবান থেকেছে।

ইওরোপীয় অনুসন্ধানকারীরা মরিশাসকে ভারত মহাসাগরের ‘তারকা’ এবং ‘মূল চাবিকাঠি’ বলে বর্ণনা করেছে। ইওরোপীয়রা ইওরোপ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগের লক্ষ্যে সমুদ্র রেখার নিরাপত্তার জন্য এখানে নিজেদের অবস্থানের তাগিদে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালে পোর্ট লুইয়ে সকলের জন্য নিরাপত্তা এবং বিকাশ শীর্ষক “সাগর” এ ভারত মহাসাগরের বিষয়ে তার কৌশল নিয়ে প্রথমবার বক্তব্য রাখেন।

মরিশাস সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ এফ ডি আই প্রবাহের বড় সূত্র আর সেই কারণেই ভারতের অর্থনীতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের বড় ভূমিকা রয়েছে। আফ্রিকী ইউনিয়ন, ভারতীয় মহাসাগর বলয় সংগঠন এবং ভারত মহাসাগর কমিশনের সদস্য হিসেবে আফ্রিকা মহাদেশ এবং ভারত মহাসাগর বলয় রাষ্ট্র সমূহে ভারতের কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে মরিশাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

উভয় দেশ পরস্পরের অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, তার নিরিখে মরিশাস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীদ্বয় তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রসারিত করার বিষয় সহমত প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রভিন্দ জগনাথের ভারত সফর দুটি দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। (মূল রচনাঃ রণজিৎ কুমার)

Comments