পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের অবমাননা অব্যহত


পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা একাধারে সরকারের একপেশে নীতি, অন্যদিকে দেশের জনগণ, বিশেষ করে চরমপন্থীদের অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। পাকিস্তানে হিন্দু, শিখ ও খ্রীশ্চান সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কাছে তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন অনেকসময় বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ইসলামের অবমাননার নামে অনেক সময়ই সংঘ্যালঘুদের দমন করতে আইনী পন্থা বেছে নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় গ্রন্থ অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। স্থানীয় মসজিদের প্রধান ইমামের অভিযোগের ভিত্তিতে ঐ চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়। যেসমস্ত অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়, তা ধর্মীয় অবমাননা আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর কয়েক সপ্তাহ আগে পাঞ্জাব প্রদেশে এক দম্পতির বিরুদ্ধে একইভাবে ধর্মীয় অবমাননাকর মেসেজ পাঠানোর অভিযোগে এই আইন প্রয়োগ করা হয় এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। লাহোরের উপকন্ঠে নারোওয়ালিনে শিখদের ধর্মীয় স্থান গুরু নানক প্যালেস গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিশেষ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এগুলি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুল সংখ্যায় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননা আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে আসিয়া বিবির বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার ঘটনাটিতে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া সত্বেও সেখানে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঐ আইন প্রয়োগ অব্যহত রয়েছে।

এই আইনের বলেই জনগণ অনেকসময় দলবদ্ধভাবে গণপ্রহারেও যোগ দিচ্ছে। সিন্ধ’এ ঐ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি নির্দিষ্ট সংঘ্যালঘু সম্প্রদায়ের দোকানপাট ব্যাপকহারে জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা জনগণের ঐ মনোভাবেরই প্রতিফলন।

পাকিস্তানের এই ধর্মীয় অবমাননা আইনটিতে অনেক ফাঁক রয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই তা অস্পষ্ট এবং দমনমূলক যা একপেশেভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। বহু নিরীহ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভুয়ো অভিযোগ এনে ব্যক্তিগত জিঘাংসা মেটানো হচ্ছে।

পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ধর্মস্থানগুলির নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয় নি। দীর্ঘদিন ধরে এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থলগুলি চরমপন্থীদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। এই দীর্ঘ তালিকায় গুরু নানক প্যালেস ধ্বংসের ঘটনা সাম্প্রতিকতম সংযোজন। উল্লেখ্য, সেখানে স্থানীয় মানুষজনই এই কাজে অংশ নেয়। এই কাজের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ হয় নি। এমনকি পঞ্চদশ শতাব্দীর ঐ ঐতিহাসিক গুরুদোয়ারার দরজা জানালা সহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী খুলে নিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব ছিল। এই ঘটনা শিখদের ধর্মীয় ভাবাবেগের ওপর বিরাট আঘাত এবং তা ভারত ও পাকিস্তানের কর্তারপুর করিডোর উদ্যোগের প্রক্রিয়াতেও বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে উঠবে। এই ঘটনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। তবে প্রশ্ন হল, অতীতে পাকিস্তান এ ধরণের ঘটনার বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নিয়েছে।

পাকিস্তানের মুসলিম সম্প্রদায়ভূক্ত না হলে তাকে ‘কাফীর’ আখ্যা দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সংবিধান এই ধর্মীয় ধারণাকে সমর্থন করে। জাতীয় স্তরে সংখ্যালঘুদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নেই। যদিও পাকিস্তানের সংসদে ৫ শতাংশ আসন সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত।

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং হিন্দু মন্দির, গুরুদোয়ারা এবং গীর্জার মতো ধর্মীয় স্থানের কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হয় নি। পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্থান ধ্বংসকারী বা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননা আইনের অপপ্রয়োগকারীদের শাস্তিদানের কোনো ব্যবস্থা নেই। এগুলির ফলে শিয়া হাজারা এবং আহমদিয়া সম্প্রদায় সহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

(মূল রচনা – জয়নাব আখতার)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভৈভব (VAIBHAV) শিখর সম্মেলন ২০২০

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়