ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়
অর্থমন্ত্রী শ্রীমতি নির্মলা সীতারমন বলেছেন যে উৎসবের মাসগুলিতে ভোগ্য পন্যের চাহিদা যথেষ্ঠ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত উৎসবের মরসুম চলে। ‘নিক্কেই ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেসিং ম্যানেজার্স সূচক অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী বলেন যে অতিমারির ফলে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে আর্থিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনাও সহায়ক হয়েছিল। পারচেসিং ম্যানেজার্স সূচক যখন ৫০এর ওপরে থাকে তখন তাতে সম্প্রসারণ এবং তার নীচে থাকলে সেটিকে সঙ্কোচনের ইঙ্গিত বলে মনে করা হয়। পারচেসিং ম্যানেজার্স সূচক অগাস্ট মাসে ৫২ ছিল এবং সেপ্টেম্বর মাসে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৫৬৫.৮, যা ২০১২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ বলে অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করেন।
উৎসবের মরসুমে গাড়ি বিক্রির পরিমাণও বছরের প্রেক্ষিতে বৃদ্ধি পেয়ে দুই অঙ্কে পৌঁছেছে বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। দুই-চাকার গাড়ি বিক্রয় বছরের প্রেক্ষিতে দেশের কিছু অংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি রফতানি, চালান, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য এবং রাসায়নিক সহ বিভিন্ন উপাদানের রফতানিও ইতিবাচক হয়ে উঠেছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ভান্ডার প্রায় ৫৫৫১২ কোটি মার্কিন ডলার, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০২১-২২ অর্থ বছরে ভারতীয় অর্থনীতি আবার তেজী হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের অনুমান অনুযায়ী, ভারতীয় অর্থনীতিটি সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান বৃহত অর্থনীতি ছিল। ২০১৯-২০ তে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধি হার ছিল ৪.২ শতাংশ, যেখানে ২০১৯-এ চীনের ছিল ৬ শতাংশ।
তবে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের অনুমান, আগামী বছরে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপানের বিকাশ হার চীনকে ছাড়িয়ে যাবে কেননা তাদের অনুমানের হিসেবে ভারতের বিকাশ হার হবে ৮.৮ শতাংশ এবং চীনের হবে ৮.২ শতাংশ।
আরও একটি বিষয় হ'ল 'ঋণের কিস্তি স্থগিত’ সম্পর্কিত ঘোষণা যাতে ঋণগ্রহীতারাও উপকৃত হতে চলেছে। ২০২০র ২ নভেম্বর নভেম্বর, সুপ্রিম কোর্ট ঋণের কিস্তি স্থগিতাদেশের আবেদনের শুনানি করার জন্য নির্ধারিত করেছে এবং "সুদের হারে কীভাবে মকুব করা হবে" তা জানাবেন। অর্থ মন্ত্রকের মাধ্যমে কেন্দ্রের দায়ের করা হলফনামায় ঋণগ্রহীতাদের একটি বড় অংশ স্বস্তি পেয়েছে। হলফনামায় বলা হয়েছে যে চক্রবৃদ্ধি সুদের এবং সরল সুদের মধ্যে পার্থক্য ঋণগ্রহীতাদের অ্যাকাউন্টে ৫ই নভেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়া হবে।
২০২০ সালের মার্চ মাসে, সরকার সকল মেয়াদী ঋণের জন্য "আত্মনির্ভর ভারত" আর্থিক গুচ্ছ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসাবে ঋণের কিস্তির ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। এটি ঋণ মকুব নয়, এবং এটি হ’ল ইএমআই জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর প্রকল্প ছিল। ঋণগ্রহীতাদের পরে সেই না দেওয়া ইএমআইগুলি ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
এই ঘোষণাটি কেবল ব্যাংক, এনবিএফসি (বা ব্যাঙ্ক বহির্ভুত আর্থিক সংস্থাগুলি) এবং রাষ্ট্রীয় সমবায় ব্যাংকগুলির কাছ থেকে নেওয়া ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের জন্য ছিল। এর মধ্যে রয়েছে হাউজিং ফিনান্স সংস্থাগুলি এবং ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলির ঋণগ্রহীতারা। এমএসএমই, শিক্ষা, আবাসন, ইত্যাদি এই ঋণের কিস্তি পরে প্রদানের জন্য যোগ্য।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ বলেছেন, অর্থনীতিতে আবার ঘুরে দাঁড়াবার লক্ষণ দেখা গেছে তবে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির হার চলতি অর্থবছরে নেতিবাচক বা শূন্যের কাছাকাছি থাকতে পারে। এটি মূলত চলতি অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) অর্থনীতিতে ব্যাপক ২৩.৯ শতাংশ সংকোচনের কারণেই। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন যে ২৫ শে মার্চ থেকে আরোপ করা লকডাউনটি জীবিকার থেকে জীবন রক্ষার ভিত্তিতেই ছিল।
লক্ষণীয় বিষয়, ২০২০ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে পূর্ব বছরের প্রেক্ষিতে [প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল, এই বছরের জন্য এই পতন ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক রাষ্ট্রসঙ্ঘ কনফারেন্স-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রথমবার ইউরোপীয় সঙ্ঘেরও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ ২০২০০ কোটি ডলার থেকে ৭০০ কোটি ডলার কমেছে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৬১শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৫১০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মুদ্রানীতি কমিটি তাদের হিসাব ঘোষণা করে জানিয়েছে যে ২০২১-২২-এ আর্থিক বৃদ্ধি ৯.৫ শতাংশ হ্রাস পাবে। মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশের ওপরে থাকায় মুদ্রানীতি কমিটি নীতিমালার হারগুলিকে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী নীতিমালার উর্দ্ধসীমায় বহাল রেখেছে। আর্থিক নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারে নগদের যোগান দেওয়া, সমস্যাটিকে কিছুটা সমাধান করতে পারবে বলে আশা করা যায়। সাম্প্রতিক ভাইরাস সংক্রমণ সংক্রান্ত অতিমারি মজবুত আর্থিক নীতিগুলির পাশাপাশি মূলত অর্থনৈতিক উত্থান নির্ধারণ করতে পারে।
ভারতীয় অর্থনীতির লড়াইয়ের ক্ষমতার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের ৫ লক্ষ কোটি ডলার অর্থনীতির হয়ে ওঠার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
[মূল রচনা- ডক্টর লেখা এস চক্রবর্তী]
Comments
Post a Comment