ইমরান খানের বহুবিধ দুর্দশা

পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী ইমরান খান দুই দিনের চীন সফরে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান সেনা বাহিনীর প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াও শ্রী খানের সফরের একদিন আগেই বেজিং-এ পৌঁছান এবং চীনের সেনা প্রধান জেনারেল ঝাঙ্গ ইউজিয়া এবং পিপলস লিবারেশন আর্মির সদর দপ্তরে শীর্ষ স্থানীয় সামরিক আধিকারিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জেনারেল বাজওয়া চীনের রাষ্ট্রপতি শি চিনফিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং-এর সঙ্গে ইমরান খানের আলোচনার সময়েও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ইমরান খান এই নিয়ে এক বছরেরও কম সময়ে তৃতীয়বারের জন্য চীন সফরে গিয়েছিলেন। 

এই সফরের পরে জারি হওয়া যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের মধ্যে ‘নতুন যুগের অংশীদারিত্বের এক ভবিষ্যৎ গোষ্ঠী’ তৈরির লক্ষ্যে ‘পাক-চীন সব সময়ের কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারিত্ব’কে আরও মজবুত করার কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়। 

যেমনটি মনে করা হয়েছিল ঠিক তেমন ভাবেই এই যৌথ বিবৃতিতে জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে একটি অধ্যায় জুড়ে দেওয়া হয়। রাষ্ট্র সঙ্ঘ প্রস্তাবের বিষয়ে পাকিস্তানের প্রসঙ্গের কথা উল্লেখ করে তাদের পরিতুষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত তা যে রূপায়নযোগ্য নয় চীন সেটা বুঝেই পাকিস্তানকে সুস্পষ্টভাবে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতেই এই বিষয়টির সমাধানের বার্তা দেয়। 

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যে, প্রধানমন্ত্রী শ্রী খানের রাষ্ট্র সঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণের অব্যবহিত পরেই এবং চীনের রাষ্ট্রপতির ভারত সফরের একদিন আগে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিষয়ক টাস্ক ফোর্স- FATF-এর বৈঠকের আগেই তাঁর এই সফর ছিল। উল্লেখ্য, FATF-এর এই বৈঠকে পাকিস্তানের অঙ্গীকারগুলির রূপায়ন মূল্যায়ন করে তাদের ‘ধূসর’ থেকে ‘কালো’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে কী না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। চীনের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে শ্রী খান ও জেনারেল বাজওয়ার কাশ্মীর বিষয়কে তুলে ধরা খুবই স্বাভাবিক ছিল যাতে এই দুই দেশ এই বিষয়ে একই মত পোষণ করে এমন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। 

রাষ্ট্র সঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে শ্রী খানের বক্তব্য ও তাঁর চীন সফর নিয়ে পাকিস্তানেই কিন্তু মিশ্র প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়েছে। ইমরান খান কাশ্মীর প্রসঙ্গে রাষ্ট্র সঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে যে আবেগী ভাষণ দিয়েছিলেন সে বিষয়ে পাকিস্তানের অধিকাংশ বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন বিশ্লেষকরা তার বাস্তবানুগ মূল্যায়ন করেন। তারা জানান যে ইমরান খান পাকিস্তানে তার রাজনৈতিক মুনাফার জন্য যাই বলুন না কেন ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও ৩৫ক বাতিল করার সিদ্ধান্তের ওপর সেই ভাষণ কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। 

আরও অনেকে বলেছেন যে অতীতেও জুলফিকর আলি ভুট্টো, বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরীফও এই ধরণের ভাষণ দিয়েছিলেন এবং কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গীতে সেগুলিও বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। এ ছাড়াও বিশ্ব জুড়ে এই নতুন কৌশলগত পরিবেশে এবং চীন সহ ভারতের সম্ভাব্য ক্ষমতা ও সমস্ত বিশ্ব শক্তির কাছে তার প্রাসঙ্গিকতার প্রেক্ষিতে এক স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের উত্থান এবং উদীয়মান বিশ্ব গঠনে ভারত আরও বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে বিশ্বে ভারতের এক পরিচিতি গড়ে উঠেছে। 

ইমরান খান ও তাঁর লোকজনেরা এটা বুঝতে পারছেন যে ভারতীয় পদক্ষেপ পাকিস্তান রাজনীতিতে ইমরান খানকে সহায়সম্বলহীন করে দিয়েছে। তাঁর বিরোধীদের কাছেও সমালোচনা করার সুযোগ এসে গিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় পদক্ষেপের বিষয়টি আগে থেকে ধরতে না পারার জন্য তারা ইমরান খানের রাজনৈতিক অজ্ঞতা ও অযোগ্যতার কথা বলতে শুরু করেছেন। বিলওয়াল ভুট্টো তো ইমরান খান ও তার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরামর্শদাতাদের (সেনা বাহিনী) বলেন যে, ইমরান খান হলেন এক কাঠপুতুল মাত্র ও তার সুতো অন্য কেউ ধরে টানছে। এই অবস্থায় ইমরান খানের নীতির বিরুদ্ধাচারণের জনপ্রিয় মতামতের ওপর ভিত্তি করেই মৌলানা ফজালুর রহমান রাজনৈতিক লাভের লক্ষ্যেই ইসলামাবাদ অভিমুখে লং মার্চের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পাকিস্তানে খান সরকার মুদ্রাস্ফীতি, কর্ম সংস্থানের অভাব, রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগের নিম্নমুখী প্রবণতায় হাবুডুবু খাচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও পরামর্শদাতা কোম্পানি তাদের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখিয়েছে যে দেশের অর্থনীতির ওপর জনগণের আস্থা কমছে। পাকিস্তান পেয়েছে ৩৩.৮ যেখানে ভারত পেয়েছে ৬২.৯। আগামী ছয় মাসের স্বল্পমেয়াদী পূর্বাভাষ খুবই তমসাচ্ছন্ন যেখানে ৭৯ শতাংশ মানুষ বলছেন যে পাকিস্তান ভুল দিশায় চলেছে। 

ইমরান খানের ক্ষীণ হয়ে যাওয়া জনপ্রিয়তায় সেদেশের বিরোধীরা তাদের রাজনৈতিক ভাগ্য ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবতে শুরু করেছে। ইমরান খানকে আরও দুর্বল করতে ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কতটা মজবুত তা পরীক্ষা করে দেখতে বিলওয়াল ও নওয়াজ শরীফ উভয়েই ফজালুর রহমানের লং মার্চের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন ।

[মূল রচনা- ডক্টর অশোক বেহুরিয়া]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভৈভব (VAIBHAV) শিখর সম্মেলন ২০২০

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়