ভারতের পূবে কাজ করার নীতির অগ্রগতি
রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ ফিলিফিন্স এবং জাপানে দু দিনের সফর সেরে এলেন। এই দুটি দেশ ভারতের পূবে কাজ করার নীতির গুরুত্বপূর্ণ ধারক। সফরের প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ফিলিপিন্স সফরে যান। এর পর তিনি জাপানী সম্রাট নারুহিতোর রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে জাপান সফর করেন।
অভিন্ন মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের দরুণ ফিলিপিন্স ভারতের পূবে তাকাও নীতির একটি গুরুত্বপূর্ব উপাদান। আন্তর্জাতিক আইন ও অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্ব তুলে ধরতে এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক শৃংখলার অগ্রগতিতে ভারত এবং ফিলিপিন্স স্বাভাবিক অংশীদার। ভারত-ফিলিপিন্স সম্পর্ক গড়ে উঠেছে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা এবং মজবুত গণতান্ত্রিক নীতির ওপর এবং পূবে কাজ করার নীতির কাঠামোয় তাতে আরো গতি সঞ্চারিত হয়েছে। সফরকালে সামুদ্রিক ক্ষেত্রে চারটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে ভারত-ফিলিপিন্স সম্পর্কে এক নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলি হল নিরাপত্তা, পর্যটন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতি। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ এবং মহাকাশের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহযোগিতাও আলোচিত হয়েছে। রাজনীতি-নিরাপত্তা-অর্থনীতিতে বৈচিত্র এবং মানুষে মানুষে সম্পর্ক এই দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্বের রূপরেখা তৈরি করে। শ্রী কোবিন্দ ম্যারিয়াম কুইজন সিটিতে মহাত্মা গান্ধীর আবক্ষ মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন।
এই দুটি দেশকে দ্রুততম বিকাশশীল অর্থনীতিতে গণনা করা হয়। ভারত ও ফিলিপিন্সের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ফলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের এক মজবুত ভিত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির মেক ইন ইন্ডিয়া প্রয়াস এবং ফিলিপিন্স এর রাষ্ট্রপতি রোড্রিগো ডুটের্টের বিল্ড, বিল্ড বিল্ড প্রয়াস বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের প্রভূত সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সেই কারণেই উভয় দেশ স্মার্ট সিটি, বন্দর, বিমান বন্দর এবং ডিজিটাল ই-ওয়ের মত উন্নত এবং আধুনিক পরিকাঠামো নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছে।
ভারত-ফিলিপিন্স বাণিজ্য সম্মেলন এবং চতুর্থ আসিয়ান-ভারত বাণিজ্য শিখর বৈঠকে ভারতের রাষ্ট্রপতি ডিজিটাল শিল্প, অভিনবত্ব ও স্টার্ট আপ্স, স্বাস্থ্য, ওষুধপত্র এবং কৃষি উন্নয়নের মত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রতি জোর দিয়েছেন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজের পরিমাণ ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত দু’ বছরে বৃদ্ধির পরিমাণ ১৭ শতাংশ। ভারতীয় কোম্পানীগুলি বস্ত্র, তথ্য প্রযুক্ত এবং ওষুধপত্রের মত ক্ষেত্রের প্রতি মনোসংযোগ করছে। এছাড়া, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণের মত ক্ষেত্রেও প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ মেক ইন ইন্ডিয়া, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্কিল ইন্ডিয়া, গঙ্গা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প, স্বচ্ছ ভারত মিশন, স্মার্ট সিটি এবং জয় জীবন মিশনের মত ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতগুলিতে অংশ গ্রহণের জন্য ফিলিপিন্স নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানান।
দ্বিতীয় পর্যায়ে জাপান সফরে, ভারতীয় রাষ্ট্রপতি সম্রাট নারুহিতোর রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এই উপলক্ষ্যে সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞী রাজকীয় ভোজসভা এবং প্রধানমন্ত্রী শিঞ্জো আবে সরকারী ভোজসভার আয়োজন করেন। সভ্যতার সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে রাষ্ট্রপতি সুকিজি হঙ্গোয়ানজি বৌদ্ধ মন্দির দর্শন করেন। তিনি টোকিওতে সম্রাট মেজি এবং তাঁর পত্নি সম্রাজ্ঞী সোয়াকিনের প্রতি উৎসর্গীকৃত মেজি স্থলও পরিদর্শন করেন।
শ্রী কোবিন্দ কাকেগাওয়ায় সিনো সোতো মন্দিরের প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ভারতের রাষ্ট্রপতির জাপান সফর ভারত-জাপান সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান গভীরতা এবং পরিধির স্বাক্ষ্য বহন করে। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের অভিন্ন মূল্যবোধ এবং একই সঙ্গে কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্থের মেলবন্ধন স্থায়ী অংশীদারিত্বের এক মজবুত ভিত গড়ে তুলেছে। ২০১৯এর ডিসেম্বরে নির্ধারিত ভারত-জাপান বার্ষিক শিখর সম্মেলনের আগে ভারত প্রথম বিদেশ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা ২+২ আয়োজন করতে চলেছে। এপর্যন্ত ভারত ও জাপান সহকারী মন্ত্রী পর্যায়ের ২+২ বৈঠকের আয়োজন করে।
দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব এশিয়ার অন্তঃস্থলে রয়েছে ভারতের পূবে কাজ করার নীতি, তাই ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে সর্বোচ্চ স্তরে রাজনৈতিক শক্তি নিয়োজিত করার কাজ চালিয়ে যাবে। রাষ্ট্রপতি কোবিন্দের সফর এই পথকে অনেকটা সুগম করেছে। বর্তমান ভৌগলিক রাজনৈতিক এবং কৌশলগত পরিধির নীতিকাঠামোয় ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষেত্র বৃহত্তর অবস্থান নিয়ে বিরাজ করছে, তাই ভারতের পক্ষে প্রয়োজনীয় হল এই অঞ্চলের কৌশলগত অংশীদারিত্বের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সর্বোতভাবে নিয়োজিত থাকা। (মূল রচনাঃ ড.তিতলি বসু)
Comments
Post a Comment