ভবিষ্যৎ আর্থিক দিশার অনুমোদন ভারত-মার্কিন কৌশলগত ফোরামের

ভারত-মার্কিন কৌশলগত ফোরামের দ্বিতীয় বৈঠক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার সাম্প্রতিক মার্কিন সফরকালে ভারতকে আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি করার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছিলেন। ভারত-মার্কিন কৌশলগত ফোরামের প্রতিনিধিদল তার অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করার বিষয়ে ভারতের সংকল্পের প্রতি তাদের বিশ্বাস ব্যক্ত করেছে।

শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক কার্যনির্বাহী এবং কূটনীতিকদের সমন্বয়ে গঠিত এই ফোরাম একটি বিষয়ে সহমত পোষণ করেছিল যে ভারতের পরবর্তী পাঁচ বছর বিশ্বের আগামী ২৫ বছরের অবস্থা তুলে ধরবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মতামতের সঙ্গে একমত জানিয়ে ফোরামের প্রতিনিধিদল যথাযথভাবে এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দূরদর্শিতাকে সমর্থন করেছে। ফোরামটির নেতৃত্বে আছেন জন চেম্বার্স। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন মার্কিন শীতল যুদ্ধ যুগের কিংবদন্তী কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার, মার্কিন প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইস এবং প্রথম সারির বাণিজ্যিক সংস্থার 300রও বেশি মুখ্য কার্যনির্বাহীগণ।

ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গত কয়েক দশকে তাদের সম্পর্ককে গুণগতভাবে বিকশিত হতে দেখেছে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী পীযূষ গোয়ালও এই বিষয়টিকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমান সময়ে সবথেকে ভালো অবস্থায় রয়েছে। এই মজবুত অবস্থাকে মাথায় রেখেই বিশেষজ্ঞরা ২০২৫ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ২৩৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা ভাবছেন। একই সঙ্গে, ভারত ভালভাবেই অবগত যে মার্কিন কূটনৈতিক কাজকর্মে বাণিজ্য বিষয়গুলিই প্রাধান্য পাচ্ছে। পারস্পরিক সহমতির লক্ষ্যে ভারত তার জাতীয় স্বার্থকে জুড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিয়েছে। শ্রী গোয়াল, ফোরামকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত যে নতুন বাণিজ্য চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে সে বিষয়ে জানান। এটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের উদ্বেগজনক দিকগুলি যথাযথ করার প্রতি এক প্রয়াস হতে পারে।

শ্রী মোদী ভারতকে ‘সহজে ব্যবসা করার’ ক্ষেত্রকে আরও উন্নত করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলি সম্পর্কে ফোরামকে অবহিত করেন। অর্থনৈতিক বিকাশের লক্ষ্যে বেসরকারী বিনিয়োগকে উত্সাহিত করতে ভারত সময়মত বাণিজ্যিক কর হ্রাস করেছে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শিল্পোদ্যোগীদের জন্য এক অনুকূল পরিবেশে সৃষ্টির সম্পর্কে বিশদে কথা বলেছেন। বাস্তবে, ভারত সাম্প্রতিক কয়েক বছরে স্কুলগুলিতে ‘অটল’ পরীক্ষাগারের মাধ্যমে উদ্ভাবনকে প্রাতিষ্ঠানিককরণের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ফোরামকে আরও জানান যে ভারতের শক্তি ৩টি ‘D’র মধ্যে সমাহিত যা হলো – ডেমোক্র্যাসি বা গণতন্ত্র, ডেমোগ্রাফি বা জনসংখ্যা এবং ‘দিমাগ’ বা বুদ্ধির। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের চেয়ে ভারতীয়দের বৌদ্ধিক-শক্তি সম্পর্কে ভালই জানে। সিলিকন ভ্যালি হলো ভারতীয় প্রতিভাদের জীবন্ত সাক্ষ্য যা মার্কিন অর্থনীতিকে আরও উঁচুতে নিয়ে গিয়েছে।

ভারত-মার্কিন ব্যবসায়িক সম্পর্ক সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত চুক্তি-ভিত্তিক উৎপাদন ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের জন্য যথাযথভাবেই দেশকে উন্মুক্ত করেছে। এটা সত্য যে মার্কিন বৃহত উত্পাদনকারী সংস্থাগুলি চীনের বিকল্প খুঁজছে। পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ সেই সুবিধা নেওয়ারও চেষ্টা করেছে। তবুও, ইংরেজী ভাষায় ভারতের দক্ষতা এবং ক্রমবর্ধমান দক্ষ কর্মী সম্পদ ও সহজে ব্যবসা করার উপযুক্ত পরিবেশে থাকায় ভারত একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগের গন্তব্য হিসাবে উঠে এসেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডক্টর এস জয়শঙ্কর ফোরামকে যথার্থই বলেন যে এখন থেকে ব্যবসাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হতে চলেছে। ডক্টর জয়শঙ্কর উল্লেখ করেছিলেন যে মানবসম্পদের গুণগত রূপান্তরণের বিষয়ে ভারত সরকারের প্রয়াস দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক সম্পদ হয়ে উঠবে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে হিউস্টনের শীর্ষ মার্কিন শক্তি সংস্থার প্রধান কার্যনির্বাহীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন। পরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে জ্বালানী শক্তি সংক্রান্ত আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যান ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। শ্রী প্রধান ফোরামকে জানান যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের জ্বালানি বাণিজ্য চলতি বছরে ১০বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এশীয় ভূ-রাজনীতির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রেক্ষিতে সেখান থেকে তেল আমদানি যে ভারতের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভারতের সেই ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি ভারত সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতেই দেখছে। ভারত এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেল গ্যাস সংস্থানও ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনের পদস্থ সদস্যদের ভারতে নির্ধারিত সফরের আগেই শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে ফোরামের এই আলোচনা হয়। পারস্পরিক সুবিধা-সম্পন্ন একটি ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি অবশ্যই সমৃদ্ধ এক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য যথাযথ হবে।

[মূল রচনা- মনীশ আনন্দ]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভৈভব (VAIBHAV) শিখর সম্মেলন ২০২০

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়