মাদ্রিদ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে ভারতের অবস্থান
জলবায়ু পরিবর্তন একটি জ্বলন্ত সমস্যা যার প্রতিকূল প্রভাব থেকে বিশ্বের কোনো দেশই মুক্ত নয়; কারণ এই সমস্যা কোনো একটি দেশের কার্যকলাপ বা উদাসীনতার ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব ভারতের ওপর পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অসময়ে বৃষ্টিপাত, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং শৈত্যপ্রবাহ হচ্ছে, খাদ্যোৎপাদন ও স্বাস্থ্যের ওপরেও এর প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে।
মাদ্রিদে সদ্য সমাপ্ত জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন – CoP 25’এ, ২০১৫ সালে গৃহীত প্যারিস চুক্তি ২০২০’র মধ্যে কার্যকর করার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা রূপায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়।
দুই সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সমস্ত সতর্কবার্তা ও তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং মানব সভ্যতাকে এই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার বিষয়গুলি পর্যালোচনা করে দেখা হয়। রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃ সরকার প্যানেল – IPCC সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব হ্রাস করতে হলে সমস্ত রাষ্ট্রকে আরো সক্রিয় হতে হবে।
রাষ্ট্রসংঘের পরিবেশ সংক্রান্ত কর্মসূচীর আওতায় নির্গমনের মাত্রা সংক্রান্ত ২০১৯’এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্ব উষ্ণায়নের মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার সম্ভবনা হাতছাড়া হতে চলেছে।
IPCC’র বিশেষ রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বর্তমানের হারে বিশ্ব উষ্ণায়ন চলতে থাকলে ২০৩০ থকে ২০৫২ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে।
২০১৫’র প্যারিস জলবায়ু শিখর সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একযোগে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আশঙ্কার মোকাবিলায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে রাখার বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে সক্রিয় করা এবং ক্রমে এই হার ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়াস গ্রহণ। মাদ্রিদ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল, একটি বিশ্বজনীন অভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণে দেশগুলিকে সম্মত করানো।
২০১৭’য় চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইঊনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের মাত্রা ছিল মোট নির্গমনের প্রায় ৬০ শতাংশ। ভারত ২০৩০’এর মধ্যে এই নির্গমনের মাত্রা ৩৩ – ৩৫ শতাংশ হ্রাসের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নতুন দিল্লি এই লক্ষ্যে চারটি মূল কর্মসূচীর ওপরে গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে অন্যান্য জ্বালানি উৎসের ব্যবহার বাড়ানো, গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমন সম্পূর্ণ বন্ধ করার লক্ষ্যে পরিবেশ বান্ধব শিল্পায়নের পরিকল্পনা, গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বদান এবং দূষণ বিহীন বিদ্যুতচালিত বাহনের ব্যবহার।
ভারত মাদ্রিদ সম্মেলনে গান্ধীজীর দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন ভাবনাকে তুলে ধরে। ভারত জানায়, দীর্ঘস্থায়ী বিকাশের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের প্রধান, কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী প্রকাশ জাভারেকর জানান, ভারত মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে নির্গমনের মাত্রা ২১ শতাংশ কমিয়েছে এবং প্যারিস সম্মেলনে নির্ধারিত ৩৫ শতাংশ নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অগ্রসর হচ্ছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় অগ্রসর ৬টি দেশের মধ্যে অন্যতম হল ভারত। তিনি আরো বলেন ভারত প্যারিস সম্মেলনে নির্ধারিত ১৭৫ গিগাওয়াট নবীকরণযোগ্য শক্তির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ইতিমধ্যেই ৮৩ গিগাওয়াট নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। ভারত বর্তমানে এই লক্ষ্যমাত্রা ৪৫০ গিগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
এটা স্পষ্ট যে বিশ্ব বর্তমানে একটি ব্যাপক পরিবেশগত এবং মানবিক সংকটের সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তন এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যা। জৈব জ্বালানির ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা না কমালে এর মোকাবিলা সম্ভব নয়।
( মূল রচনাঃ এন ভদ্রন নায়ার)
Comments
Post a Comment