জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের শতবর্ষ

আজ ১৩ই এপ্রিল। আজ থেকে শতবর্ষ আগে এমনই এক দিনে ভারতবর্ষের ইতিহাসে ঘটে গিয়েছিল এক জঘন্য হত্যালীলা যাকে এক ঠান্ডা মাথায় হত্যা করার ইতিহাস বলা যেতে পারে।  পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই রক্তক্ষয়ী হত্যার ইতিহাসের শতবার্ষিকী আজ। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ কর্নেল রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ১০০০ নিরপরাধ পুরুষ ও মহিলাকে। শুধু তাই নয় শিশুদেরও ছাড় দেয় নি ব্রিটিশ পুলিশ।
এই নৃশংস হত্যাকান্ড ব্রিটিশ ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। এই অপরাধের পাশবিকতা ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদেরও আতঙ্কিত করে তুলেছিল। ১৯২০ সালে ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সে এই হত্যাকান্ড নিয়ে বিতর্কে, ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর যার বিদ্বেষ সর্বজনবিদিত সেই স্যার উইনস্টন চার্চিলও এই হত্যাকান্ডকে ‘অতি দানবীয়’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
ভারতের জাতীয় কবি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত নাইটহুড সম্মান ১৯১৯ সালের ৩১শে মে ত্যাগ করার কথা ঘোষণা করেছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকান্ডের পরে। তিনি বলেছিলেন ‘সন্ত্রাসের নীরব যন্ত্রণা’ এবং ভারতের আতঙ্কিত মানুষজনের ‘অপমান’-এর কারণেই তিনি নাইটহুড সম্মান ত্যাগ করছেন।
১৯৪৫ সালে রাষ্ট্র সঙ্ঘ তৈরি হওয়ার পরে এই ধরণের অত্যাচার অপরাধ নির্মূল করার লক্ষ্যে ভারতের সম্মিলিত জাতীয় অনুভুতি প্রকাশের এক জায়গা খুঁজে পেল। ভারত এই ধরণের অপরাধকে বে-আইনি ঘোষণা করতে রাষ্ট্র সঙ্ঘের প্রথম সম্মেলনে ১৯৪৮-এর গণহত্যা কনভেনশনের দিশায় বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতিকে আরও সুদৃঢ় করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের জয় সম্ভব হয়েছিল ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থনের কারণেই। ১৯১৪ সালে লন্ডনে অবস্থানকালে মহাত্মা গান্ধী ভারতের তৎকালীন বিদেশ সচিবকে লিখেছিলেন বিশেষ অধিকার ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছাতেই এই সাম্রাজ্যের সদস্যপদের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছায় এই সমর্থন দেওয়া হয়েছিল।
দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার অঙ্গ হিসেবে ভারত ১৩ লক্ষ সেনা পাঠিয়েছিল এবং দেশের ১৪ কোটি ৬০ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব (যা আজকের হিসেবে প্রায় ১হাজার কোটি পাউন্ডের সমতুল) দিয়েছিল। ৭০০০০ ভারতীয় সেনা যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন এবং তাঁদের নাম নতুন দিল্লীর ইন্ডিয়া গেট যুদ্ধ স্মারক স্থলে খোদাই করে রাখা হয়েছে। কিন্তু এই বিশেষ অধিকার ভাগ করার যে কথা মহাত্মা বলেছিলেন তা নস্যাত করে ব্রিটিশরা ভারতকে স্বশাসনের অধিকার দিতে অস্বীকার করে।
পরিবর্তে অমৃতসরের এই পাশবিক হত্যাকান্ড ভারতীয়দের প্রত্যাশার ওপর বিশ্বাসঘাতকতার এক রক্তাক্ত প্রতীক হয়ে উঠল যা লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে  ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা থেকে দেশকে মুক্তি প্রদানের লক্ষ্যে তাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে তুলল; শুরু হল ১৯২০র অসহযোগ আন্দোলন ও পরিশেষে দেশ অর্জন করল স্বাধীনতা ১৯৪৭-এর অগাস্টে।
আজও, এই হত্যাকান্ড স্বাধীন ভারত ও গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে সাম্প্রতিক সম্পর্কের মধ্যেও এক ক্ষত হিসেবে রয়েই গিয়েছে। এই বেদনাময় অধ্যায়ের শতবর্ষে ব্রিটিশ সংসদে আলোচনার  জন্য এই বছরে প্রস্তুত একটি রিপোর্টে এই হত্যাকান্ডকে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর অধ্যায় বলে বর্ণিত হয়েছে।
বহু ব্রিটিশ সাংসদ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থনার কথা জানালেও ১৯১৯ সাল থেকে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনায় কেউ ক্ষমা প্রার্থনা করেন নি।
ব্রিটিশ সংসদে ২০১৯-এর ১০ই এপ্রিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের বিষয়ে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, ‘সেদিন যা ঘটেছিল ও তার জন্য মানুষের যা ক্ষতি হয়েছিল তাতে আমরা গভীরভাবে অনুতপ্ত’।
ইউরোপীয় সঙ্ঘ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তাদের ওপর পড়তে পারে তা কাটিয়ে উঠতে ভারতের মত এক উদীয়মান শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার বিষয়টি  ব্রিটেন অগ্রাধিকারর সঙ্গেই দেখছে। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডে ব্রিটেনের আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা না করা এই উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে।
মূল রচনা- অশোক মুখার্জী

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?