সুদানের সংকট
সুদানে রাষ্ট্রপতি ওমর আল-বাশিরের সময়কালে গত দিন দশকে যত পরিবর্তন হয়েছে তার থেকে বেশি পরিবর্তন হয়েছে গত এক সপ্তাহে। কয়েকমাস ধরে প্রতিবাদ চলার পর এমাসের প্রথম দিকে এক অভ্যুত্থানে ওমর আল-বসিরকে ক্ষমতা চ্যুত করা হয়।
১৯৮৯এ ক্ষমতা দখলেরপর থেকে বশির স্থায়ী জাতীয় সংকটের অবস্থার মধ্য দিয়ে তার পথ তৈরি করে নিয়েছে। তিনি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখেন এবং ফল স্বরুপ যখন দক্ষিণ সুদান ২০১১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে সুদানের এক তৃতীয়াংশ ভূখন্ড এবং তিন চতুর্থাংশ তেল রাজস্ব হারাতে হয়। দু’দশকের আন্তর্জাতিক বহিস্কারকে তিনি রাজনৈতিকভাবে নিজের অনুকূলে কাজে লাগাতে সক্ষম হন।
কিন্তু তাঁর হিসেবের দিন শেষ হয় ১১ই এপ্রিল। অধিকাংশ সুদানবাসীর কাছে এখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ হল তাদের কষ্টার্জিত বিপ্লবকে সেই সব নেতার হাত থেকে সুরক্ষা প্রদান করা যারা একে নস্যাৎ করার জন্য যা খুশী তাই করতে পারে।
বিক্ষোভকারীরা প্রাথমিকভাবে কিছুটা সফল হয়েছে। নতুন রুপান্তরকালীণ মিলিটারী কাউন্সিলের স্বনিযুক্ত প্রধানকে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি পূর্বতন শাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে মনে করা হয় এবং সেটা গ্রহণযোগ্য হবার কথা নয়। এক দিন পরেই তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
কিন্তু আরো বড় চ্যালেঞ্জ সামনে অপেক্ষা করছে। আশা করা হচ্ছে যে বিপ্লবকারীরা সামরিক শাসন থেকে সহজভাবে অসামরিক কর্তৃত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে; যাতে সুদান, শান্তি, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলে। এই চ্যালেঞ্জ আরো জটিল হয়েছে এই কারণে যে আন্দোলনের নেতারা রাজনীতিতে নবাগত। তাদের সামনে বড় কাজ হল দুরভিসদ্ধিপূর্ণ সামরিক লোকজন এবং প্রশাসনে সেই সব অভ্যন্তরীণ শক্তি যারা বর্তমান ক্ষমতা কেন্দ্রিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চায় না, তাদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করা।
প্রতিবেশি মিশর এবং অন্যান্য দেশের কাছ থেকে সুদান শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে যেখানে সামরিক একনায়কতন্ত্র জনতার প্রতিবাদের কাছে ২০১১তে ধূলিস্যাত হয়ে যায় কিন্তু সাধারণ মানুষ তার ইতিবাচক কোনো ফল পায় নি।
এটি আবশ্যক যে রুপান্তর হবে সর্বাত্মক প্রতিনিধিত্বকারী। আন্দোলনের স্বরুপ হওয়া উচিত জাতীয়ভাবে সার্বিক। বশিরকে বহিস্কারের জন্য নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ, মহিলা এবং পেশাদার শ্রেণী, শহর ও গ্রামের সাধারণ দরিদ্র মানুষ বশিরের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন, এগিয়ে এসেছিলেন নেতৃত্ব দিতে। যারা বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন, পরবর্তি পর্যায়ে তাদের কেন্দ্র স্থলে থাকতে হবে। বশিরের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির কিছু শক্তিকে জায়গা দেবার প্রয়োজন হতে পারে।
সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই রুপান্তর হতে হবে অসামরিক শক্তির নেতৃত্বাধীন। অন্য কোনো সামরিক শাসনের এই স্থান দখল করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আগামী দিনের সংকট হতে পারে বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিভাজন যার ফলে হিংসাও দেখা দিতে পারে। পরিবর্তন আনতে বাস্তবতার নিরিখে। জনগণের স্বাধীনতার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সম্প্রসারণ ঘটানো, নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরি এবং অবাধ, ন্যয় সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করানোর মত বিষয়গুলির প্রতি অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গে ন্যয় বিচারকেও সুনিশ্চিত করতে হবে। বশিরের যথাযোগ্য বিচার হতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গণহত্যা, যুদ্ধ অপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য তার বিচারের চেষ্টা চলছে। সর্বাত্মক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,ইওরোপ, জাপান,ভারত এবং অন্যান্য দেশ সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনোতিক দিক থেকে সুদানের অসামরিক নেতৃত্বের সহায়তায় এগিয়ে আসা। সুদানের অন্তর্জাতিক সঙ্গীরা অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনে তাদের সহায্য করতে পারে।
এই সংকটের মূহুর্তে বিপ্লব নিরাপদ নয়। সুদানের সামরিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত নেতারারা বিক্ষোভোকারীদের আশাকে বাঞ্চাল করে দিয়ে সফল হতে পারে। তবে সুদানের নাগরিকরা তাদের অধ্যাবসায়, সাহসিকতা এবং সংকল্পের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ঠিক পথে এগিয়ে চলেছে। দেশকে উন্নততর ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার দিশার সংকেত তারা স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছে। (মূল রচনাঃ অশোক সজ্জানহার)
Comments
Post a Comment