চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড যোজনায় ভূটান শরিক হবে না
ভূটান, কোনও নির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়েই এ মাসের শেষ নাগাদ পেইচিং’এ নির্ধারিত দ্বিতীয় BRI মঞ্চের সম্মেলনে অংশ না নেবার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ২০১৭’র মে মাসে অনুষ্ঠিত BRI মঞ্চের প্রথম সম্মেলনও ভূটান বয়কট করে। ওই সময় দেশটির বক্তব্য ছিল- BRI একটি নতুন প্রকল্প,কাজেই প্রকল্পটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানার পরেই সে এতে যোগদানের চিন্তা ভাবনা করবে।
BRI যোজনাটির বিষয়ে ভারত ও ভূটান মোটামুটি এক অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। ভারত দ্বিতীয় BRI মঞ্চের সম্মেলনে অংশ না নেবার কথা জানানোর তিন দিন পরেই ভূটান অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিল। অপরদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, যেমন বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা এতে অংশ নেবে বলে জানিয়েছে। ভারতের অবস্থান হল-আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত বিধিনিয়ম, আইনের অনুশাসন, স্বচ্ছতা ও সমতার আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই BRI’এর মত যে কোনও সড়ক সংযোগ যোজনার রূপরেখা রচনা করতে হবে; আর এই যোজনা সংশ্লিষ্ট কোনও দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার পরিপন্থী যেন না হয়, তাও সুনিশ্চিত করতে হবে।
ভূটানে সম্প্রতি সরকার পরিবর্তন হলেও দেশটির বিদেশ নীতিতে স্পষ্ট ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর এরই প্রমাণ স্বরূপ ভূটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ডঃ লোতে শেরিং BRI যোজনাটির বিষয়ে ভারতেরই অনুরূপ তাঁর দেশের অবস্থান ব্যক্ত করলেন।
উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৬৮ সালে ভারত ও ভূটানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের আদর্শে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্রমাগত মজবুত হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অপর দেশগুলির সামনে এক দ্ব্বিষ্টান্ত স্বরূপ হয়ে উঠেছে। ডঃ লোতে শেরিং ভূটানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পরেই ২০১৮ সালে নতুন দিল্লি সফরে আসেন। এই সফরে রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহ ভারতের শীর্ষ সরকারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ জড়িত বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে তিনি মতামত বিনিময় করেন। নতুন দিল্লি সব সময়েই প্রতিবেশি দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নী প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিয়ে আসছে। ভূটানের দ্বাদশ পরিকল্পনার জন্য ভারত ভূটানী মুদ্রায় ৪৫ বিলিয়ন নু(Ngulstrum) সহায়তা দিয়েছে। এ ছাড়াও দুটি দেশ ভূটানে যৌথভাবে ১০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ভূটান, এখনও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে নি। তবে ভূটানে এখন একটি প্রায় বাম মুখি সরকার ক্ষমতায় আসায় পেইচিং কর্তৃপক্ষ, কিছুটা উৎসাহিত হয়েই BRI যোজনাটিতে থিম্পুকে সামিল করতে চাইছে। আর এই উদ্দেশ্যে চীন এ পর্যন্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশন ভূটানে পাঠিয়েছে। ২০১৮’র জুলাইয়ে চীনের উপ বিদেশমন্ত্রী কং কুয়াংইয়ু থিম্পু সফরে আসেন। ওই সময় ডোকলাম অচলাবস্থা প্রসঙ্গ সহ একাধিক বিষয় নিয়ে তিনি ভূটানী নেতৃবর্গের সঙ্গে আলোচনা করেন। এবং ওই দেশকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রূপায়ণে অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি ছাড়াও BRI যোজনাতে যোগ দিতে থিম্পুকে আমন্ত্রণ জানান। এর পর এ বছরের ফেব্রুয়ারীতে ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লু ঝাউই তাঁর দেশের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল সহ থিম্পু সফরে যান। এই সময় তিনিও ভূটানী নেতৃবর্গকে BRI যোজনাটিতে যোগ দিতে অনুরোধ করেন ও থিম্পুতে একটি চীনা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যালয় স্থাপনের অনুমতি চান।
চীন BRI যোজনায় ভূটানকে জড়িত করার সরকারিভাবে উদ্যোগী হওয়া সত্বেও দেশটি পেইচিং’এর যাবতীয় চাপ উপেক্ষা ক’রে দ্বিতীয় BRI মঞ্চের সম্মেলনে অংশ নিতে অস্বীকার করল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে ভারতের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্র নীতির আদর্শের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাবার মাধ্যমেই যে ভূটানের দীর্ঘকালীন স্বার্থ পূরণ হবে থিম্পু কর্তৃপক্ষ তা অনুধাবন করতে পেরেছে। (মূল রচনাঃ-ডঃ নিহার আর নায়েক)
Comments
Post a Comment