ভারত-মার্কিন সম্পর্ক
ভারতে নিযুক্ত প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট ব্ল্যাকউইল, বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসৃত বিদেশ নীতির মূল্যায়নে তাঁকে বি-প্লাস র্যাঙ্ক দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশনীতির এই মূল্যায়ন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বারের জন্য মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে তাঁর প্রচারভিযান শুরু করেছেন। অপরদিকে ভারতেও কিছু দিনের মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্বভার গ্রহণ করছে। রবার্ট ব্ল্যাকউইলের নেতৃত্বে মার্কিন বিদেশ সম্পর্ক পরিষদ-CFR, এক বিশেষ রিপোর্টে ট্রাম্পের বিদেশনীতিকে আপাত দৃষ্টিতে যা মনে হয়, তাঁর তুলনায় ভাল বলেই রায় দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক মজবুত করার উদ্যোগে ট্রাম্প প্রশাসন কৃতিত্বের দাবি করতে পারেন বলে রিপোর্টে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ভারতকে অত্যাধুনিক সামরিক উপকরণ ও প্রযুক্তি সরবরাহ, ওয়াশিংটনের নতুন ভারত-প্রশান্তমহাসাগরীয় কৌশলগত নীতিতে নতুন দিল্লিকে শরিক হিসেবে গ্রহণ,দক্ষিণ এশিয়া সংক্রান্ত মার্কিন নীতি কৌশলে ভারতের ভূমিকার স্বীকৃতি, অস্ত্র হস্তান্তর বিষয়ে NATO’র সদস্য দেশগুলির অনুরূপ নতুন দিল্লিকে গণ্য করা ও নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক সামরিক মহড়ার আয়োজনের মত পদক্ষেপগুলি প্রাক্তন রাষ্ট্রদূতের মতে দেশটির জাতীয় স্বার্থের পক্ষে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে।
অপরদিকে ট্রাম্প প্রশাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, শুল্ক নীতি, H1B ভিসা প্রসঙ্গ ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে GSP প্রণালীর মত ভারতের স্বার্থ পরিপন্থী নানা ব্যবস্থা নিলেও ব্ল্যাকউইল ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত অংশিদারিত্বের ক্ষেত্রে ভা্রতের ভূমিকাকে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম কৃতিত্ব দিয়েছেন।
ভারত- মার্কিন সম্পর্কের সামগ্রিক দিকটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দুটি দেশের সরকার অনেক উতার চড়াও’এর মধ্য দিয়েই একটি দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সফল হয়েছে; বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন মতাদর্শ গড়ে তুলতে পেরেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জলবায়ু পরিবর্তন নীতি ভারতের ওপর অনেক প্রতিকুল প্রভাব ফেলেছে। তা সত্বেও নতুন দিল্লি দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্ব অনুধাবন করেই বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে। অর্থনৈতিক বিষয়ে মতপার্থক্য যাতে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের আদর্শের পথে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে নতুন দিল্লি সবসময়েই ওয়াকিবহাল। কৌশলগত সহযোগিতা মজবুত করার উপায় হিসেবে ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝাতে মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের সচেষ্ট হতে হবে।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে এক ধরণের উদার বাণিজ্যিক নীতি অনুসরণের মধ্যে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থ জড়িত আছে, তা না অনুধাবন করে ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এরই প্রতিবাদে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে দুই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছেন। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত একাধিক সিদ্ধান্ত-যেমন ইরান ও রাশিয়ার ওপর শাস্তি ব্যবস্থা জারি, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনের বেরিয়ে যাবার ঘোষণায় আমেরিকার বেশ কয়েকটি মিত্র ও কৌশলগত অংশীদার দেশ অসন্তোষ ব্যক্ত করেছে। তবে ভারতের প্রসঙ্গ উঠলে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যথেষ্ঠ কূটনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে নতুন দিল্লির সম্পর্কে সহৃদয়তা বজায় রেখে চলতে সফল হয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার কয়েকটি দীর্ঘ দিনের মিত্র ও শরিক দেশের সম্পর্কে যে তিক্ততা দেখা দিয়েছে, সেই সিব সিদ্ধান্ত না নিলে বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে তিনি এক সফল রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারতেন।
অপরদিকে, ভারত উপযুক্ত দক্ষতার সঙ্গেই যে তার পররাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতি পরিচালনা করছে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি লাভ করা সম্ভব হয়েছে। (মূল রচনাঃ- ডঃ চিন্তামণি মহাপাত্র)
Comments
Post a Comment