ধারাবাহিক বিস্ফোরণে শ্রীলংকায় শান্তি বিঘ্নিত
ইস্টার সানডের শান্তিপূর্ণ সকাল শুরু হয়েছিল এই দ্বীপ রাষ্ট্রের গীর্জায় গীর্জায়। হঠাৎ সকাল শেষ হবার আগেই ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ প্রত্যক্ষ করলো শ্রীলংকা। প্রথমে রাজধানী কলম্বোর একটি গীর্জাঘরে বিস্ফোরণ, তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দ্বিতীয় বিস্ফোরণ পূর্ব উপকূলের বাট্টিকালোয়ার অন্য একটি গীর্জায়। এখানেই থেমে থাকে নি বিস্ফোরণের ধারাবাহিকতা, এর পর আরও একটি গীর্জায় আর একটি বোমা ফাটলো। এছাড়াও কলম্বোর তিনটি বিলাসবহুল হোটেলে পর পর বিস্ফোরণের ভয়াবহতা। এই দ্বীপ রাষ্ট্রের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের লোকজন যখন ইস্টারের প্রার্থনায় যোগ দিচ্ছিলেন তখনই ঘটে যায় একের পর এক এই সব বিস্ফোরণের উন্মত্ততা। উল্লেখ্য, শ্রীলংকায় ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ।
ছ’ঘন্টার স্বল্প সময়ের মধ্যে মোট আটটি বোমার বিস্ফরোণ ঘটে। ২০০বেশি মানুষ প্রাণ হারালেন এবং ৫০০র বেশি আহত। শ্রীলংকার ইতিহাসে এযাবৎকালের ভয়াবহতম আক্রমণ। মৃতদের মধ্যে তিনজন ভারতীয় ছাড়াও ছিলেন ইওরোপ, আমেরিকার বহু পর্যটক। অনেকের কাছে ২০০৮এর ২৬শে নভেম্বরের মুম্বাই জঙ্গী আক্রমণের মতই ছিল এই জঙ্গী হানা। ঐ ঘটনায় বিখ্যাত তাজ হোটেলে বিদেশী জঙ্গীরা আক্রমণ চালিয়েছিল।
অধিকাংশ পর্যবেক্ষকদের কাছেই এই আক্রমণ ছিল সুসমন্বিত এবং সুনির্দিষ্ট। এথেকে মনে হয় কোনো আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে এই আক্রমণের পিছনে। যদিও কোনো জঙ্গী গোষ্ঠী এখনও এই আক্রমণের দায় স্বীকার করে নি তবে শ্রীলংকার পুলিশ সূত্র স্বীকার করেছে এটি জিহাদী মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাজ বলে কিছু গোয়েন্দা তথ্য তাদের হাতে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংঘে নিজেও স্বীকার করেছেন যে এই আক্রমণের পেছনে কাদের হাত রয়েছে সে বিষয়ে তার সরকারের কিছুটা ধারণা হয়েছে, তবে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিস্তারিত জানাতে অস্বীকার করেন।
কলম্বোর উপকন্ঠে নিরাপত্তা বাহিনী এক তল্লাসী চালালে গুলি বিনিময়ে তিনজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হন। দিনের শেষে জিজ্ঞেসাবাদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনী আটজন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে। একটি গীর্জায় আত্মঘাতী বোমাবাজ হামলা চালায় বলে মনে করা হচ্ছে।
সারা বিশ্বের নেতারা কলম্বো আক্রমণের নিন্দা করেছেন এবং শ্রীলংকা সরকারের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। ভারত তীব্রভাষায় এই আক্রমণের নিন্দা করেছে এবং শ্রীলংকার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন । প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রপতি সিরিসেনা এবং প্রধানমন্ত্রী বিক্রমসিঙ্ঘের সঙ্গে কথা বলেছেন। শ্রী মোদি এই আক্রমণকে ঠান্ডামাথায় বর্বরোচিত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন ভারত শ্রীলংকাকে সব রকমভাবে সহায়তা করতে প্রস্তুত। ভারতের অনেক রাজনৈতিক নেতাও শ্রীলংকায় আক্রমণের নিন্দা করেছেন।
জঙ্গীরা সর্বাধিক প্রভাব ফেলতে চেয়েছিল বলেই হয়তো নরম লক্ষ্যবস্তু বেছে নেয় বলে অনেকের ধারণা। তারা এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ এবং বিশেষ করে পশ্চিমী দেশগুলির কাছে একটা বার্তা দিতে চেয়েছিল। জঙ্গীদের উপস্থিতির ব্যপকতা বোঝাতেই হয়তো তারা পূর্বের বাট্টিকালোয়া এবং পশ্চিমের কলম্বোতে হানা দেয়। হোটেলে আক্রমনের লক্ষ্য হতে পারে আন্তর্জাতিক প্রভাব ফেলার চেষ্টা এবং দেশের পর্যটন শিল্পের প্রতি আঘাত করা। মনে রাখতে হবে, পর্যটন শ্রীলংকার অর্থনীতির প্রধান উপাদান। দেশের মধ্যে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা ইস্টার সানডের দিন গীর্জায় আক্রমণের উদ্দেশ্য বলে মনে হয়।
তিন বছর আগে লাহোরে ইস্টারের সময় বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে রবিবারের আক্রমণের তুলনা করা যায়। ঐ আক্রমণে ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পাকিস্তান সঠিক শিক্ষা এখনও নিতে পারছে না তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নির্ণায়ক পদক্ষেপ নিতেও ব্যর্থ। তাই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় অন্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তেও তারা পিছু পা হচ্ছে। তবে এই বার কলম্বো থেকে বার্তা অধিকতর সুস্পষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই জঙ্গীদের নাগালের বাইরে নয়। এই ভয়াবহ পাশবিক বলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই চালানোই হল একমাত্র উপায়। এই অঞ্চলের কোনো সরকার যদি এই বার্তা অবজ্ঞা করে তবে তারা কেবলমাত্র নিজের বিপদই ডেকে আনবে।
(মূল রচনাঃ এম কে টিক্কু)
Comments
Post a Comment