সমস্যায় পাকিস্তানের অর্থনীতি

পাকিস্তান বর্তমানে যে সংকট জনক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে,তা কাটিয়ে ওঠার জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের দ্বারস্থ হওয়া সত্বেও, তার কাছে থেকে এখনও কোনও ইতিবাচক সাড়া না মেলায়, পরিস্থিতিতে কোনও উন্নতি হবে বলে অনুমান করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। আর এ কারণে সেদেশের  অর্থমন্ত্রী আসাদ উমর পদত্যাগও করেছেন। ইসলামাবাদ বিষয়টিকে তেমন গুরুতর নয় বলে জানালেও, ঘটনা হল ইমরান খান সরকারের এখনও একবছরও পূর্ণ হয় নি এবং তাদের অর্থ মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হওয়ায় সেখানকার বাস্তব পরিস্থিতি খুব সহজেই বোঝা যায়।
ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের কাছে এই আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ১৮০০ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও চীন ইতিমধ্যেই সুলভ হারে ঋণ দিয়েছে পাকিস্তানকে এবং এর পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি ডলার। বিশ্লেষকগণ মনে করছেন যে ওয়াশিংটন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার আগে আরও ২ মাস এই অর্থ দিয়ে চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে, যদিও এই সহায়তা প্রয়োজনীয়  অর্থের তুলনায় অনেকটাই কম। মনে করা হচ্ছে এই সহায়তার পরিমাণ ৮০০ থেকে ১২০০ কোটি মার্কিন ডলার হতে পারে। তবে এই সহায়তার সঙ্গে কঠোর শর্ত আরোপও হতে পারে।
পাকিস্তানে জিনিসপত্রের  দাম যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে ইমরান খান সরকার জনগণের উদ্বেগ ও ক্ষোভের সম্মুখীন হচ্ছে। এই সব দ্রব্যসামগ্রীর অধিকাংশের ওপর সরকার বেশ কয়েকবার ভর্তুকি প্রদান করেছিল। তা সত্বেও দেশটির  মুদ্রাস্ফীতির হার বর্তমানে ৯.৫ শতাংশ যা ২০১৩ সালের নভেম্বরের পরবর্তী সময়কালে সর্বাধিক। পাকিস্তানে, বিশেষ করে, খাদ্য সামগ্রী ও জ্বালানীর দাম যে ভাবে হুহু করে বেড়ে চলেছে,তাতে সাধারণ মানুষের দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে।
ইস্তফা দেওয়ার পরে আসাদ উমর বলেন, এখন যে ব্যক্তিই অর্থমন্ত্রী হিসেবে আসুন না কেন, তাঁর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জানা উচিত। তিনি আরও বলেন, যখন আমরা ক্ষমতায় এলাম তখন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবথেকে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে চলছে;  ভালো খারাপ দুই থাকবে তবে এখনকার খারাপ পরিস্থিতিটি প্রকৃত অর্থেই অত্যন্ত খারাপ।
পাকিস্তানের এই প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী জানান যে,  পাকিস্তানের তেহ্‌রিক-এ-ইনসাফ পার্টি এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বেশ কয়েকটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং তাতে কিছু উন্নতি পরিলক্ষিতও হয়েছিল। তবে শ্রী উমর বলেন নতুন অর্থমন্ত্রীকে এক ভিন্ন অর্থনীতির সম্মুখীন হতে হবে। শ্রী উমর যে সব কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেন তার মধ্যে রয়েছে খাদ্য সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামে আরও বৃদ্ধি। এটা নতুন সরকারের কাছে বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যেই অত্যাবশ্যক সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে দেশ ব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হয়ে গিয়েছে।
ইমরান খানের নির্বাচনী প্রচারে  ১০ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার এখনও কিছুই হয় নি। ‘নতুন পাকিস্তান’ গড়ে তোলার বিষয়টিও শত যোজন দূরেও দেখা যাচ্ছে না।
এই ভয়াবহ আর্থিক পরিস্থিতিতে ইমরান খান সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়ে দেশের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক বিকাশ হারের  সম্ভাবনা ৪ শতাংশ হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে যা, বর্তমান সরকারের ধার্য লক্ষ্যমাত্রা ৬.২ শতাংশের অনেকটাই নীচে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল পাকিস্তানের  বিকাশ হার ২০১৯ সালে ২.৯ শতাংশ ও ২০২০ সালে তা ২.৮ শতাংশ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও পাকিস্তান পিপল্‌স পার্টির চেয়ারম্যান বিলওয়াল ভুট্টো জারদারির মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধ পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের কাছেই এক কমিক রিলিফ হয়ে উঠেছে। শ্রী খান প্রথমে আফ্রিকাকে একটি দেশ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং তারপরে ইরানে তাঁর সরকারি সফরে তিনি বলেন জাপান ও জার্মানির মধ্যে সীমান্ত রয়েছে এবং এর পরেও শ্রী খানের দপ্তর বা পাকিস্তানের বিদেশ দপ্তর থেকে এই বিষয়টি সংশোধন করার কোনো প্রয়াস নেওয়া হয় নি। এই সব বিবৃতি সেদেশে যথেষ্ট হাসিক খোরাক সৃষ্টি করেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিলওয়াল ভুট্টো জারদারি এক ট্যুইটে ইমরান খান ঐ  বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিকেট কোটায় ভর্তি হয়েছিলেন কিনা প্রশ্ন করেন। শ্রী খানের এই ধরণের বিবৃতিতে পাকিস্তানের বহু মানুষ লজ্জা বোধ করছেন।
পাকিস্তানী অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে গিয়ে ইমরান খান   আর কোনো বেফাঁস মন্তব্য করবেন না বলেই এখন দেশের মানুষের প্রত্যাশা। পাকিস্তানে এই সময়  প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যদি তা না হয় জনগণের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে। আর ইমরান খানের মনে রাখা প্রয়োজন, এখনও পর্যন্ত কোনো পাকিস্তানী  প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যকালের পুরো মেয়াদ সম্পূর্ণ করতে পারেন নি।
[মূল রচনা- কৌশিক রায়]
                                                 

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?