চীনের বেল্ট এবং সড়ক প্রয়াসের বিষয়ে ভারতের সুস্পষ্ট অবস্থান
ভারত বেল্ট এবং সড়ক প্রয়াস (বি আর আই)তে যোগদানের জন্য চীনের আমন্ত্রণ আবার প্রত্যাখ্যান করেছে। এমাসের পরের দিকে চীনে এই সম্মেলন হবার কথা। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ভারত বি আর আই মঞ্চে অংশ গ্রহণের আমন্ত্রণ অস্বীকার করল। ভারত এর আগে ২০১৭তে এই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়। এবছর বিভিন্ন সরকারের ৪০জন নেতা সহ ১০০টি দেশের প্রতিনিধি দ্বিতীয় বেল্ট এবং সড়ক ফোয়ামে অংশ গ্রহণ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের অভিমত হল চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) কে বেল্ট এবং সড়ক প্রয়াসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করায় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখন্ডতা সম্পর্কে ভারতের উদ্বেগের প্রতি তাদের উপলব্ধি এবং সংবেদনশীলতার অভাবই প্রতিফলিত হয়। উল্লেখ্য, সিপিইসি ভারতের রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের অবৈধভাবে পাকিস্তান-অধিকৃত অংশের ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে। বিভিন্ন সময় এই সব উদ্বেগের কথা চীনের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে। চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্পকে একত্রিত করা হয়েছে সি পি ই সির মাধ্যমে। সি পি ই সি চীনের বৃহত্তম প্রদেশ শিনজিয়ানকে পাকিস্তানের বালুচিস্তান স্থিত গদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করবে।
ভারত মনে করে সংযোগ প্রয়াসের ভিত্তি হওয়া উচিত সর্বজন স্বীকৃত নিয়ম, সুশাসন ও আইনের অনুশাসন, উন্মুক্ততা, স্বচ্ছতা এবং সাম্য। তাদের উচিত আর্থিক দায়দায়িত্বের নীতি অনুসরণ করা এবং সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখন্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তা করা উচিত।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০১৭র মে মাসে বি আর আই সম্পর্কে ভারত বলছিল যে সংযোগ উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়র সঙ্গে তারা একমত এবং ভারত বিশ্বাস করে যে সংশ্লষ্ট সকল পক্ষই সমানভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে এবং ভারসাম্য বজায় থাকবে। এই অঞ্চলে ভারতের উন্নত সংযোগের কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয় ভারতের অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক প্রয়াসের অবিচ্ছেদ্য অংগ হল সংযোগ সম্প্রসারণ ও তা মজবুত করা। পূবে কাজ করার নীতির আওতায় ভারত ত্রিপাক্ষিক মহাসড়ক প্রকল্প রুপায়ণের লক্ষ্যে কাজ করছে। ভারত মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গেও বহুমুখি যোগাযোগ স্থাপন করছে। পশ্চিমে যাও নীতির আওতায় নতুন দিল্লী চাবাহার বন্দর প্রকল্পে ইরানের সঙ্গে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক উত্তর দক্ষিণ করিডোরের বিষয়ে অন্যান্য মধ্য এশিয় দেশগুলির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে চলছে।
ভারত যখন চীনের বি আর আই এর বিষয়ে নীতিগত এবং সাহসী অবস্থান নেয় তখন এর তেমন কোনো সমর্থক ছিল না কিন্তু এখন চীনের বি আর আই এর আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিণতির বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন এটি বেশি করে উপলব্ধি করা যাচ্ছে যে এই অঞ্চলে চীনের এই প্রকল্প অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনক নয় এবং পরিবেশগত দিক থেকেও উপযুক্ত নয়। অনেক দেশকেই ঋণের ফাঁদে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ স্বরুপ মালদ্বীপ চীনের উচ্চাকাংখ্যামূলক বেল্ট এবং সড়ক প্রয়াসের ফলে ব্যাপক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। শ্রীলংকার হ্যামবান্টোটা এর অপর দৃষ্টান্ত। মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য কিছু দেশও এর শিকার হয়েছে। এমনকি যে পাকিস্তানে চীন ৪৬ বিলিয়ন ডলারের মত বিনিয়োগ করেছে, সেখানেও আশংকা করা হচ্ছে যে এই দেশ ক্রমে চীনের অর্থনৈতিক উপনিবেশ হয়ে উঠবে।
চীনের বেল্ট এবং সড়ক প্রয়াসের বিষয়ে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুদৃঢ়। ভারত এবং চীনের উচিত ২০১৭র জুনের আস্তানা ঐক্যমত্যের আদর্শে দুটি দেশের মধ্যে উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। এই আদর্শ অনুসারে দুটি দেশ স্থির করেছে যে তাদের সম্পর্ক আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার সহায়ক হবে এবং তারা সুনিশ্চিত করবে যাতে তাদের মত- পার্থক্য বিবাদে পরিণত না হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে চীনকে আন্তর্জাতিক সৌর জোটে যোগ দিতে হবে। ভারত, ফ্রান্সের সঙ্গে অংশীদারিত্বে এই জোট গড়েছে। চীনের প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত গৌতম বাম্বাওয়ালের মতে এর ফলে দুটি দেশের আন্তর্জাতিক স্তরে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে। (ড.রুপা নারায়ন দাস)
Comments
Post a Comment