পাকিস্তানের দায়িত্বহীন বিবৃতি

পাকিস্তানে এক অদ্ভুত খেলা চলছে বলে মনে হচ্ছে। পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রী শাহ মহম্মদ কুরেশী মুলতানে ভারতের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য অভিযোগ করে বলেন যে পুলওয়ামা পরবর্তি উত্তেজনার মধ্যে নতুন দিল্লী আগামী দিনে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। ভারত পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রীর এই দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অবিশ্বাস্য বিবৃতি খারিজ করে দিয়েছে। কঠোর ভাষায় এর জবাব দিয়ে ভারত বলেছে এই ধরণের প্রতারণামূলক কৌশলের সাহায্যে পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গীরা ভারতে আক্রমণের ছক কষছে বলে মনে হয়। নতুন দিল্লী আরো জানিয়েছে, পাকিস্তানের উচিত এই ধরণের প্রলাপের পরিবর্তে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সমস্ত ভূখন্ড থেকে চালানো জঙ্গী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন তেহরিক-এ-ইন্সাফ পার্টির বর্তমান হতাশার ফলেই শ্রী কুরেশীর এই রুপ মন্তব্য। এটা মোটামুটি অনেকেরই জানা যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে অনেক বিষয়েই পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রীর মতের মিল হচ্ছ না।
এটিও সর্বজন বিদিত যে তাঁর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক উচ্চাশা। পাকিস্তানী রাজনীতির দুর্ভাগ্যপূর্ণ দিক হল ভারতের সমালোচনামূলক রাজনৈতিক বিবৃতি অনেকের কাছেই স্বাগতযোগ্য। তাই এতে অসম্ভবের কিছু নেই যে শ্রী কুরেশীও সেই চালই চালছেন। তবে একজন দায়িত্বশীল বিদেশ মন্ত্রীর কাছ থেকে এই ধরণের বিবৃতি অনভিপ্রেত।
এখানে এটা উল্লেখ করা আবশ্যক যে ভারত এমন একটি দেশ যারা কখনই কোনো দেশের বিরুদ্ধে কু-অভিপ্রায় পোষন করে নি। পাঁচ হাজার বছরের  ইতিহাসে এই দেশ কখনো আক্রমণকারীর ভূমিকা নেয় নি। তবে দায়ত্বশীল দেশ হিসেবে বহিঃশত্রুর আগ্রাসন থেকে সর্বদাই নিজেকে রক্ষা করার অধিকার তারা সংরক্ষিত রাখে। ১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানই ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে। প্রত্যেকবারই পাকিস্তানের দুঃসাহসকে ভারত পর্যুদস্ত করেছে। এটা খুবই রহস্যের যে মার্কিন এবং চীনা প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী ভারতের সামরিক শক্তির সমকক্ষ হতে পারে নি।
চারটি যুদ্ধ সত্বেও ভারত এখনও তার পশ্চিমের প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে দুপা এগিয়ে। ভারতের সমস্ত রাজনৈতিক দল সম্পর্ক স্বাভাবিক করায় আগ্রহী, তবে পরিস্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে দুটি দেশের মধ্যে কোনো রকম আলোচনার আগে পাকিস্তান থেকে সৃষ্ট সমস্ত রকম সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলি সেদেশের জন্ম লগ্ন থেকেই ভারত-বিরোধী কার্যকলাপে পরস্পরকে পেছনে ফেলার চেষ্টায় তৎপর রয়েছে। এটি সর্বজন বিদিত যে ভারত-বিদ্বেষী বিবৃতি দিয়েছে যে সব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ তাদের ভবিষ্যৎ অনেকটা উজ্জ্বল বলে তাদের ধারণা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকর আলি ভুট্টর সেই উক্তি ‘ভারতের বিরুদ্ধে হাজার বছর ধরে যুদ্ধ চালানো’ অথবা ‘পরমাণু বোমা তৈরির জন্য দরকার হলে পাকিস্তান ঘাস খেয়ে থাকবে’ ইত্যাদি ভোলার নয়। এই ধরণের বিবৃতি প্রমাণ করে যে পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের কর্মসূচির দরকার নেই, ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারত বিদ্বেষী উক্তিই যথেষ্ট।
আরো মনে রাখতে হবে যে, এই ধরণের জমকালো বিবৃতি সত্বেও পাকিস্তানী রাজনীতিবিদরা পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানকে এক সঙ্গে ধরে রাখতে পারে নি। দেশের অস্তিত্বের ২৪ বছরের মধ্যেই ভাষার প্রশ্নে তারা দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ এবং সামরিক নেতারা এর জন্য দায়ী। ভুট্টোর মত অনেককেই এই ধরণের কার্যকলাপের জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য দায়ী পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সমস্ত পদক ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং অসম্মানজনক মৃত্যুর ফলে তাকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে হয়।
একটি রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান সর্বদাই পরিচয়ের সংকটে ভুগেছে। ধর্মের ভিত্তিতে এই দেশ গঠিত হয়েছিল, এবং তার চেয়েও বড় কথা পাকিস্তানী শাসকরা জনগণের কথা না ভেবে নিজেদের স্বার্থ ধর্মকে কাজে লাগিয়েছে। আজ এই দেশ নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা হারাতে বসেছে। অনেক দেশ তাদের প্রতিটি গতিবিধির প্রতি দৃষ্টি রাখছে। পাকিস্তান নিজের সংশোধন না করলে অবস্থা বিপজ্জনক হতে পারে। (মূল রচনাঃ কৌশিক রায়)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?