ভারত-ভিয়েতনাম সম্পর্কে নতুন গতি

উপরাষ্ট্রপতি এম ভেঙ্কাইয়া নাইডু চার দিনের সফরে ভিয়েতনাম সফরে গিয়েছিলেন। ভিয়েতনামের সঙ্গে সর্বাত্মক কৌশলগত সম্পর্কের আরো  প্রসার ছিল এই সফরের মূল লক্ষ্য। উল্লেখ্য, ভারত ও ভিয়েতনামের  মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। উপরাষ্ট্রপতি নাইডু ঐ সফরে ভিয়েতনামের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়াও একটি অনুষ্ঠানে সেখানকার  প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভাববিনিময় করেন। শ্রী নাইডু  ভিয়েতনামের উপরাষ্ট্রপতি জাং থি নক থিন, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী গুয়েন জুয়াং ফুক এবং সেখানকার ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির সভাপতি গুয়েন থি কিম গানের সঙ্গে বৈঠক করেন। উপরাষ্ট্রপতি ভিয়েতনামের হা নাম প্রদেশের ট্যাম চুক প্যাগোডায় আয়োজিত রাষ্ট্রসংঘের ষোড়শ ভেসক উৎসবে মূল ভাষণ দেন। এই অনুষ্ঠানের মূলভাবনা ছিল – “আন্তর্জাতিক নেতৃত্বে বৌদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যৌথ দায়িত্ব”।
উভয় দেশের মধ্যে নিয়মিত আদান প্রদানের ফলে ২০১৬তে প্রধানমন্ত্রীর ভিয়েতনাম সফরের পর থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একটি সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়। ২০১৮’র জানুয়ারিতে ভিয়েতনামের  প্রধানমন্ত্রী এবং ২০১৮’র মার্চে সেদেশের রাষ্ট্রপতি ভারত সফরে আসেন এবং গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেন। এরই পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবেই ভারতের উপরাষ্ট্রপতির এই সফর। এই সমস্ত সফরের ফলে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে  সহযোগিতা আরো মজবুত হয়েছে। অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো মজবুত হয়েছে। দুদেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কও আরো ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব হয়েছে। উভয় দেশেরই অভিন্ন লক্ষ্য হল, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রসার।
উপরাষ্ট্রপতি নাইডু হ্যানয়ে প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাঁর ভাষণে প্রবাসী ভারতীয়দের কাছে পৌঁছনোর লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগের ওপর আলোকপাত করেন।
শ্রী নাইডু ভিয়েতনামের উপরাষ্ট্রপতি জাং থি নক থিনের সঙ্গে বৈঠকে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গড়ে তোলার ওপরে গুরুত্ব দেন।
ভারতের ‘পূবে সক্রিয়’ নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল ভিয়েতনাম। আসিয়ানে ভারতের অন্যতম সমর্থক এই দেশ। উভয় দেশই আশা করে যে, দক্ষিণ চীন সাগরে একটি আদর্শ বিধি প্রণয়নের বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ চীন সাগর সহ ভারত মহাসাগর এবং পশ্চিম ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে নিয়ে ইন্দো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গঠিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দক্ষিণ চীন সাগরে অবাধ চলাচলের পক্ষে সওয়াল করে আসছে। অন্যদিকে এটি চীনের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ বলে পেইচিং’এর অভিযোগ। চীন প্রায় সমগ্র অঞ্চলের ওপর তাদের অধিকারের দাবি জানালেও ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপিনস এবং তাইওয়ানও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের দাবি জানিয়ে আসছে।
দ্বিপাক্ষক স্তরে ভারত-ভিয়েতনাম সম্পর্ক আরো প্রসারিত হয়েছে। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, পারমানবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তেল, গ্যাস, নবীকরণযোগ্য শক্তি, পরিকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি এবং উদ্ভাবনী সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উভয় দেশের সম্পর্ক আরো মজবুত করার লক্ষ্যে প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে।
গত তিন বছরে উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষক বাণিজ্যের পরিমাণ ৭.৮  বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২০’এর মধ্যে এই পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। এই লক্ষ্যে পৌঁছনো সম্ভব হবে বলে উভয় দেশের আশা।
বর্তমানে নতুন দিল্লি ও হ্যানয়ের মধ্যে কোনো সরাসরি উড়ান নেই। তবে এ বছরের শেষে দুদেশের রাজধানীর মধ্যে বিমান চলাচলের সূচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হলে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও পর্যটন ক্ষেত্রে আদান প্রদান আরো বৃদ্ধি পাবে।
(মূল রচনা – রাজারাম পান্ডা)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?