প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় সরকারের পররাষ্ট্রনীতি


বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট NDA দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে এল। ৯০ কোটিরও বেশি ভোট দাতা বিশ্বের এই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই নির্বাচনী মহাযজ্ঞে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আবার তাঁদের আস্থা জ্ঞাপন করলেন। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় গণতন্ত্রে, এর প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন সাধনের মাধ্যনে এক নতুন ভারত গড়ার যে ব্রত নিয়েছিলেন, সদ্য সম্পন্ন নির্বাচনে তাঁর প্রতি জনগণের বিপুল সমর্থন যেন তারই স্বীকৃতি।

জনগণের এই রায় আগামী পাঁচ বছরের জন্য ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে কিছু গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসার সুযোগ এনে দিল। যাবতীয় জাতপাত ও বর্ণগত ভেদাভেদের উর্ধ্বে উঠে সকলকে জড়িত করে এগিয়ে চলার আদর্শ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী যে সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস- মন্ত্র নিয়েছেন সেটাই হবে তাঁর সরকার পরিচালনার মূল আদর্শ। এই আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আদানপ্রদান বৃদ্ধির মাধ্যমে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও মৌলিক পরিবর্তন সাধনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমান দিনে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রধান প্রধান শক্তিধর দেশ, বিশেষ করে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে সমান হৃদ্যতা বজায় রাখা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে। এই সম্পর্কের ওপরেই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক মহল থেকে নতুন নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি আমদানির সুযোগ, যা দেশে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তর নিয়ে আসার জন্য অত্যন্ত জরুরী।

বিশ্বের একটি সবচেয়ে দ্রুত বিকাশশীল দেশ হিসেবে এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় সংঘ ও আসিয়ান দেশগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান আদানপ্রদান প্রয়োজন অপরদিকে তেমনই ভারতের প্রতি প্রতিবেশী দেশগুলির আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত অর্থে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ ব্যাতিরেকে উন্নয়নী কর্মযজ্ঞকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে না। সেজন্যই স্থল এবং সমুদ্র সীমান্ত এলাকায় একটি অনুকূল পরিবেশ সুনিশ্চিত করাই হবে ভারতের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়। এর জন্য প্রয়োজন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একযোগে সংগ্রাম ছাড়াও সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা।

এশিয়ার স্বার্থে আগামী পাঁচ বছরে আফ্রিকা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সংলগ্ন সব দেশের সঙ্গে একটি কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ভারতের এই উদ্যোগেরই আভাস পাওয়া গেছে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত SAGAR কর্মসূচি এবং ২০১৮’তে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত সাংগ্রি- লা বার্তালাপে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতিতে ।

অপরদিকে, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সংলগ্ন পশ্চিমী দেশগুলির ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্র নীতির অঙ্গ হিসেবে গত পাঁচ বছরে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন যোজনা অধিক সাফল্যের সঙ্গে রূপায়ণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় ও পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে কর্মরত ৮০ লাখের মত ভারতীয় শ্রমিকদের উপস্থিতির প্রেক্ষিতে এই সব দেশগুলির সঙ্গে সরকার ক্রমবর্ধমান সহযোগিতায় আবদ্ধ। ভারতের বাণিজ্যিক ও ডিজিটাল সংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন দিল্লিকে চাবাহার বন্দর পরিকল্পনার মত বিভিন্ন প্রকল্পের সময়মত রূপায়ণের ওপর জোর দিতে হবে। কারণ এই সব প্রকল্প রূপায়ণের মাধ্যমেই আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয় দেশগুলির সামনে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও নতুন নতুন বাজারের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে পশ্চিম ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারত তার ভূমিকা আরও বেশি করে পালন করতে পারবে।

ভারতের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম উপাদান হিসেবে ভারত-আফ্রিকা মঞ্চ সম্মেলন, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সহযোগিতা মঞ্চ ও ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারেবিয়ান দেশগুলিতে ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবগুলি রূপায়ণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চালিকা শক্তি হিসেবে উদ্ভাবিত নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ ভারতের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন। কারণ ই-কমার্স ও ডিজিটাল ইন্ডিয়ার মত কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়াও ভারতের জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এই সব প্রযুক্তি তাৎপর্যপূর্ণ অবদান যোগাবে।

২০২০‘র জুন মাসে ভারত দু’বছরের জন্য রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য দেশ হিসেবে নির্বাচিত হবে। ২০২১’এ তিন বছরের জন্য রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ভারতের পুনঃনির্বাচিত হবার কথা। এছাড়াও ২০২২’এ ভারত G-20 দেশগোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এই একাধিক বহুপাক্ষিক মঞ্চে পারস্পরিক সহযোগিতার আদর্শ অধিক মজবুত করতে আন্তর্জাতিক মহলে ভারত নেতৃস্থানীয় ভূমিকা গ্রহণ করবে বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা।

(মূল রচনাঃ- অশোক কুমার মুখার্জী)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?