পঞ্চম সি আই সি এ শিখর বৈঠক এবং ভারত

এশিয়ায় সংহতি এবং আস্থা বর্ধক ব্যবস্থা সংক্রান্ত পঞ্চম শিখর সম্মেলন সি আই সি এ গত সপ্তাহান্তে তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত হল। তাজিকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি নুরসুলতান নাজারবায়েভকে সি আই সি এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় কারণ ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভায় ভাষণ দেবার সময় তিনি প্রথম সি আই সি এর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে আস্তানায় সি আই সি এর সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, এখন এটি কাজাকিস্তানের রাজধানী নুরুসুলতান হিসেবে পরিচিত। এশিয়ার ৩০টির বেশি দেশ এর সদস্য এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এই মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। কাজাকস্তান, তুরস্ক, চীন এবং তাজিকিস্তান এ পর্যন্ত এই সংগঠনের সভাপতিত্ব করেছে। 

২০০২সালে কাজাকস্তানের আলমাটিতে প্রথম সি আই সি এ শিখর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং আলমাটি আইন হিসেবে পরিচিত সনদ গৃহীত হয়। তদানিন্তন ভারতীয় প্রধান মন্ত্রী শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রথম সম্মেলনে অংশ নেন। ভারতের পেট্রলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস দপ্তরের মন্ত্রী ২০০৬এ আলমাটিতে দ্বিতীয় বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ভারতের প্রাক্তন বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রী ২০১০এর জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে তৃতীয় সম্মেলনে যোগ দেন। চতুর্থ শিখর বৈঠক হয় ২০১৪র মে মাসে। সে বছর ভারতের সংসদীয় নির্বাচন হবার অব্যবহিত পরেই এর আয়োজন করা হয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রকের উচ্চ পদস্থ এক আধিকারিক তাতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। 

এশিয়ার সি আই সি এ মঞ্চের লক্ষ্য হল সমগ্র মহাদেশ এবং তার বাইরেও স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এশিয়ায় সামগ্রিক নিরাপত্তার লক্ষ্যে একীকৃত কাঠামো গড়ে তোলার দিকে পর্যায়ক্রমে এগিয়ে চলাই এই সংগঠনের উদ্দেশ্য। এই দিশায় সি আই সি এ আস্থা বর্ধক ব্যবস্থা সমূহ গ্রহণ করে। এই ব্যবস্থাসমূহকে পাঁচটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এবং আশংকার বিরুদ্ধে লড়াই করা; অর্থনীতি; পরিবেশ; মানবতার ক্ষেত্র এবং সামরিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্র। ভারত আস্থা বর্ধক ব্যবস্থাদি, পরিবহণ, এবং জ্বালানী নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করে। 

সাধারণত চার বছর অন্তর সি আই সি এ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সম্মেলনের বিষয়ভাবনা ছিল ‘অধিক নিরাপদ এবং ‘অধিকতর সমৃদ্ধশালী সি আই সি এ অঞ্চলের জন্য অভিন্ন লক্ষ্য’। এতে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন ড.সুব্রাহ্মনিয়ম জয়শংকর। নতুন এই মন্ত্রীর মধ্য এশিয় অঞ্চলে এটাই ছিল প্রথম সফর। 

সি আই সি এর বিভিন্ন কার্যকলাপে ভারত সক্রিয় অংশগ্রহণ করে থাকে এবং নতুন দিল্লী মনে করে সি আই সি একে পর্যায়ক্রমে এশিয়ার বাস্তবতা এবং প্রয়োজন মেটাতে অব্যাহত গতিতে এগিয়ে যেতে হবে। পঞ্চম সম্মেলনে ভাষণ দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শংকর বলেন একবিংশ শতাব্দীকে এশিয়ার শতক বলে মনে করা হচ্ছে এবং শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বৃদ্ধিতে সি আই সি এ এক গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। 

তিনি বলেন আজ এশিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় আশংকা হল সন্ত্রাসবাদ। আফগানিস্তানের ঘটনাবলীর বিষয়ে ড.জয়শংকর বলেন আফগান নেতৃত্বাধীন জাতীয় শান্তি এবং আপোশরফা প্রক্রিয়াকে ভারত সমর্থন করে। 

ভারতীয় মন্ত্রী আরো জানান যে জ্বালানী নিরাপত্তার অভাব উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গ্রাহক এবং উৎপাদকের মধ্যে আলোচনা এক স্থিতিশীল জ্বালানী বাজার সৃষ্টি করতে সক্ষম বলে তিনি মনে করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এশিয়ায় বিশ্বের সর্বাধিক জ্বালানী উৎপাদক এবং উপভোক্তা রয়েছে। পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানী ক্ষেত্রে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া মন্ত্রী সি আই সি এর সকল সদস্যদেশকে আন্তর্জাতিক সৌর জোট ( আই এস এ)তে যোগ দেবার আমন্ত্রণ জানান। এই জোটের সদরদপ্তর দিল্লির নিকটে গুরুগ্রামে অবস্থিত। 

সি আই সি এর পঞ্চম শিখর বৈঠকে গৃহীত ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদ সহ বিভিন্ন উদ্বেগের বিষয়গুলি ভারত উল্লেখ করে। সমস্ত ধরণের চরমপন্থা এবং সন্ত্রাসবাদের ফলে উদ্ভুত নিরাপত্তা আশংকার বিষয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় একটি সর্বাত্মক নীতি কৌশল রচনারও তারা আহ্বান জানিয়েছে। সম্মেলনে উন্নততর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্য এবং পরিবহনের উন্নতির লক্ষ্যে উন্নত সংযোগ ব্যবস্থার আহ্বান জানানো হয়েছে। ষষ্ঠ সি আই সি এ শিখর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে ২০২২সালে। ( মূল রচনাঃ ড.আথার জাফর)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?