পাকিস্তানে বিরোধীদের কন্ঠরোধ
পাকিস্তানে ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান-তেহেরিক-এ ইনসাফ-PTI পার্টী সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কন্ঠরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইমরান সরকার, পাকিস্তান পিপলস পার্টি-PPP’র প্রধান আসিফ আলি জারদারি, ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ(নওয়াজ) পার্টীর নেতা হামজা শাহাবাজকে গ্রেপ্তার ছাড়াও পাশতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট -PTM’এর মত একাধিক বিরোধী গোষ্ঠীর ওপর দমনমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। অনেকের ধারণা, পাক সরকারের প্রচ্ছন্ন নির্দেশেই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সে দেশে আশ্রয়গ্রহণকারী মুত্তাহিদা কোয়ামী মুভমেন্ট-(MQM)’এর নেতা আলতাফ হুসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত সে দেশের সরকার, যে কোনও মহল থেকেই হোক না কেন, সরকারের কোন সমালোচনাই খোলা মনে গ্রহণ না করে, সে সবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে এর প্রতিক্রিয়া যে কত ভায়ানক হতে পারে তা এই মুহূর্তে হয়তো ইসলামাবাদ ঠিক মত অনুধাবন করতে পারছে না বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।
সম্প্রতি পাকিস্তান সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী পক্ষের তরফ থেকে সম্ভাব্য যে কোনও প্রতিবন্ধকতা এড়াতে পাক সরকার সুকৌশলে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জাতীয় দায়বদ্ধতা ব্যূরো-NAB’র সংস্থানের আওতায় বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার করেছে। এখন NAB’র নজরে রয়েছেন PML-(N)’এর প্রভাবশালী নেতা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসী ও প্রাক্তন জলসম্পদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী খাজা মহম্মদ আশিফ। এদিকে PPP নেতা বিলওয়াল ভুট্টো জারদারি ও PML-(N)’এর নেতা মারিয়ম নওয়াজ শরীফ দুবার দেখা ক’রে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন ও সরকারের বাজেটকে জন স্বার্থ বিরোধী আখ্যা দিয়েছেন। তবে PTI এই বৈঠককে সুবিধাবাদীদের বৈঠক বলে খারিজ করে দিয়েছে। বিরোধী দলগুলি তাদের নেতাদের গ্রেপ্তারকে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও বিরোধীদের কন্ঠরোধ করার ষড়যন্ত্র বলেই এর বিরুদ্ধে ক্রমশ সোচ্চার হয়ে উঠছে।
উত্তর ওয়াজিরিস্তান অঞ্চলে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় PTM’এর দুই শীর্ষ নেতার গ্রেপ্তার ও এই দলেরই একজন নেতার হত্যার ঘটনা ঐ অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, যুদ্ধ বন্দী হিসেবে তাঁদের প্রতি নির্মম আচরণ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি PTM’এর মহিলা নেতা গুলালাই ইসমাইলকে সরকার বিরোধী ভাষণের অভিযোগে পেশোয়ারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সন্ত্রাস দমন আইনের আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলাও রুজু করা হয়েছে। দেশের সুশীল সমাজ পাক সরকারের এই আচরণকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ বলে বর্ণনা করেছে।
PTM প্রধান খাক্কান আব্বাসির বিরুদ্ধে NAB তদন্ত প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। এই সংস্থার কাছে অভিযোগ, PTM’এর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতৃবৃন্দ সরকার বিরোধী কাজকর্ম চালিয়ে যেতে বাইরের বিভিন্ন সংস্থার অর্থ সাহায্য নিচ্ছে।
পাকিস্তানের বর্তমান সামগ্রিক পরিস্থিতিটি বিচার করলে দেখা যাচ্ছে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরকারের যাবতীয় দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সত্বেও সরকার বিরোধী আওয়াজ স্তব্ধ করা যাচ্ছে না। মারিয়াম নওয়াজ শরিফ ও বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠক ও দুই নেতার ‘গণতন্ত্রের সনদ’ নামক নথি স্বাক্ষর, ইমরান সরকারের অনুসৃত নীতির বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি ও পাকিস্তানের দীর্ঘকালীন রাজনীতির ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। (মূল রচনাঃ- ডঃ জয়নাব আখতার)
Comments
Post a Comment