পারস্য উপসাগরে সামরিক প্রস্তুতি
গত সপ্তাহে ওমান উপসাগরে দুটি তেলের ট্যাংকারের ওপর আক্রমণের প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ পারস্য উপসাগরে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অতিরিক্ত ১০০০ সৈন্য পাঠানোর কথা ঘোষণা করেছে। ২০১৮র মে মাসে ইরাণ পারমাণবিক চুক্তি (যৌথ সর্বাত্মক কর্মপরিকল্পনা বা জে সি পি ও এ) থেকে প্রত্যাহার করার মার্কিন সিদ্ধান্তের পর এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে এই পদক্ষেপ। উল্লেখ করা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাণের ওপর পুনরায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং গতমাসে ইরাণী তেল আমদানির ওপর থেকে সমস্ত রেহাই তুলে নিয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন শাস্তিব্যবস্থা আরোপেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ইরাণের সঙ্গে ব্যবসায় নিয়োজিত সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে আরো শাস্তিব্যবস্থার হুমকি দিয়েছেন।
ইরাণও এর জবাবে জেসিপিওএর অন্যান্য স্বাক্ষরকারীদের বিশেষ করে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানীকে ইরাণের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কম করতে আরো ব্যবস্থা নিতে বলেছে, অন্যথায় তেহেরান চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে। এই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন। তখন উপসাগরে ১৫০০ অতিরিক্ত মার্কিন সৈন্য পাঠানো হয়। এই অঞ্চলে শান্তি এবং স্থিতিশীলতার পক্ষে এই বর্ধিত সামরিক গতিবিধি একেবারেই বাঞ্চনীয় নয়।
ইরাণ বলে আসছে যে ওমান উপসাগরে ট্যাংকার আক্রমণের পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব এই নাশকতামূলক কাজের জন্য ইরাণকেই দায়ী করছে। বস্তুত পক্ষে এই দুটি দেশ মে মাসে ফুজাইরাহ উপকূলে চারটি তেল ট্যংকারে আক্রমণের জন্যো ইরাণকেই দায়ী করছে। এছাড়া, সৌদি আরব ইয়েমেনে হৌথি বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে। এই দেশের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দীর্ঘদিন থেকে সংঘর্ষে জড়িত রয়েছে।
২০১৯এর মে মাসে সৌদি আরবের একটি আরামকো তেল পাইপলাইনের ওপর ড্রোণ আক্রমণ চালানো হয়। গত সপ্তাহে দক্ষিণ নাজরান প্রদেশের আভা বিমান বন্দরে একটি হৌথি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় ২৬জন আহত হয়। সৌদি আরব এই সব আক্রমণের জন্য ইরাণ হৌথি বিদ্রোহীদের উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে। অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর কথা ঘোষণা করে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা সচিব প্যাট্রিক শানাহান বলেন ইরাণের শত্রুতামূলক আচরণের জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাণের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চায় না কিন্তু তাদের সেনা কর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এটি আবশ্যক।
মার্কিন-ইরাণ ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে এই সব ঘটনা ঘটছে সে দিক থেকে এইগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং জার্মানীর মত বিশ্বের অন্যান্য শক্তিধর দেশ উত্তেজনা প্রশমিত হবে বলে আশা করে তবে তারা এই দিশায় তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ মাসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সিঞ্জো আবের ইরাণ সফর শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় গঠণমূলক ভূমিকা পালনের জন্য ইরাণকে রাজী করানোর দিশায় এক প্রয়াস বলে দেখা হচ্ছে।
তবে ইরাণ তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। তারা সামরিক ব্যবস্থার কাছে মাথা নত করতে অস্বীকার করেছে এবং তারা মনে করে যেকোনো সামরিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতা তাদের আছে। রাশিয়া এবং চীনও পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যকলাপের সমালোচনা করেছে। এথেকে বোঝা যায় যে ইরাণ সম্পূর্ণ একা নয় এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি গুরুতর আকার ধারণ করলে তা ব্যপক আঞ্চলিক সংঘর্ষের কারণ হতে পারে। এদিকে, জানা গেছে ইরাণ একটি মার্কিন ড্রোণকে গুলি করে নামিয়েছে, রাষ্ট্রপতি একে এক বড় ভূল বলে জানিয়েছেন। এই ঘটনার ফলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ। কেবলমাত্র জ্বালানী নিরাপত্তার জন্যই নতুন দিল্লীর কাছে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা গুরুত্বপুর্ণ নয়; উপসাগরে বসবাসকারী সাড়ে আট মিলিয়ন ভারতীয় নাগরিকের সুরক্ষা এবং কল্যাণের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত। সমস্ত আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ট কৌশলগত, রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ইরাণ এবং সৌদি আরবের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। ভারত আশা করে যে সমস্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সমাধানের লক্ষ্যে এক উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির দিশায় গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে। (মূল রচনাঃ ড. মহম্মদ মুদাসির কমর)
Comments
Post a Comment