অটল রয়েছে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ভারতকে দেওয়া বিশেষ সুবিধা বা জেনারেলাইজড সিস্টেম অফ প্রিফারেন্সেস-GSP প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২৮টি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদী সরকারের দ্বিতীয় দফার শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই শিরোনামে উঠে এসেছে। কিন্তু উভয় পক্ষই কৌশলগত অংশিদারিত্বের বিষয়ে একই জায়গায় অবস্থান করছে। জাপানের ওসাকায় G-20 শীর্ষ সম্মেলনের আগে মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী মাইক পম্পেয়ো ২৫ থেকে ২৭শে জুন ২০১৯ ভারত সফরে আসছেন।

ভারতে সম্প্রতি সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরে এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা হতে চলেছে। মাইক পম্পেয়োর সফরের সময়, তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী পম্পেয়োর ভারত সফর, ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও মজবুত করার দিশায় এবং দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় সহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উভয় দেশকেই এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে।

মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী মাইক পম্পেয়ো টেলিফোনের মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে মন্ত্রীপদের দায়িত্ব নেওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন। মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে শ্রী পম্পেয়ো ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নতুন ভারত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ওপর জোর দিয়েছেন। মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী পম্পেয়ো এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এক অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, মার্কিন-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং মার্কিন-ভারত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বিষয়ে পারস্পরিক চিন্তা ভাবনা নিয়ে আলোচনাও করেছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন বিদেশ মন্ত্রক।

মার্কিন বিদেশ মন্ত্রীর নতুন দিল্লী সফরের আগেই শ্রী পম্পেয়োর কাছ থেকে টেলিফোন আসে মূলত জাপানের ওসাকায় G-20 শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠকের বিষয়ে খুঁটিনাটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার জন্যই। আশা করা হচ্ছে যে শ্রী ট্রাম্প ও শ্রী মোদী যৌথভাবে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-জাপান ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করবেন।

ভারত মনে করে যে ভারত–মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সার্বিক দিশা খুবই ইতিবাচকই রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য গত কয়েক বছরে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার এবং এই বাণিজ্যে যে কোনো ধরণের বাধা নতুন দিল্লী ও ওয়াশিংটনকে একযোগে দূর করতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, তথ্য প্রযুক্তি পেশাদারদের জন্য H1B ভিসার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত ভারতকে সরকারিভাবে কিছু জানায় নি।

ট্রাম্প-মোদী দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সময় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি এবং শ্রী পম্পেয়োর নতুন দিল্লী সফরের সময় জ্বালানী নিরাপত্তার বিষয়ে ভারতের উদ্বগের বিষয়গুলি উথ্বাপিত হতে পারে।

শ্রী পম্পেয়ো ও শ্রী জয়শঙ্কর ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ভবিষ্যতের দিশা স্থির করতে পারেন। উভয় সরকারই শ্রী ট্রাম্প ও শ্রী মোদীর মধ্যে এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্র সঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় আরও একবার বৈঠকের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ঐ একই সময়ে ওয়াশিংটনে যাবেন বার্ষিক ২+২ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে। ভারত একই সঙ্গে আশা করছে যে অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি নতুন দিল্লী সফরে আসবেন।

ভারতে 5G নেটওয়ার্ক চালু করতে চীনের টেলিযোগাযোগ কোম্পানি হুয়ায়েই-এর অংশগ্রহণের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের প্রসঙ্গে ভারত সরকারে মতামত হল এই বিষয়ে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার দিকগুলি নিয়ে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চলছে এবং এই সব বিষয়ে আলোচনা সাধারণভাবে দ্রুত সম্পন্ন হয় না। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতকে দেখে নিতে হবে যে নিরাপত্তা ও অর্থনীতি এই দুই বিষয়ের মধ্যে কোনটিকে তারা প্রাধান্য দেবে। ভারত যথাসময়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

তথ্য স্থানীয়করণ, সীমান্ত পারের ই-বাণিজ্য এবং মেধা স্বত্ত্ব অধিকারের মত বৃহত্তর বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। উভয় দেশই বোঝে যে মজবুত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটি নিরলসভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং কিছু তাৎক্ষণিক বাধা এই আন্তরিক সম্পর্কে ক্ষতি করতে পারবে না। মোদী সরকার দ্বিতীয়বারে দায়িত্ব নেওয়ার পরেই মার্কিন বিদেশ মন্ত্রীর ভারত সফর প্রমাণ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে ওয়াশিংটন কতটা প্রাধান্য দেয়। এই দুই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ আসলে একবিংশ শতকের এক স্থায়ী আন্তর্জাতিক সহযোগী।

[মূল রচনা- সত্যজিৎ মোহান্তি]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?