ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত মার্কিন রিপোর্ট খারিজ করল ভারত

ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতার সমালোচনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবারও তাদের ভন্ডামী এবং কপটতার পরিচয় দিল; অথচ এই বিষয়ে তাদের কোনো রকম নৈতিক অধিকার আছে কি না সে নিয়েই যথেষ্ঠ প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত মার্কিন সরকারের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে অন্য দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিচার করতে বসার জন্য তাদের সেই গতানুগতিক নীতির প্রয়োগে নেমেছে তারা। রিপোর্টে বলা হয়েছে ‘২০১৮য় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলির দাঙ্গাকারী উচ্ছৃঙ্খল জনতার আক্রমণ অব্যাহত’। এতে আরো বলা হয়েছে ‘ভারত তাদের ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট, বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং বহুত্ববাদী সমাজ ব্যবস্থা সহ সহিষ্ণুতা ও সর্বাত্মক নীতির জন্য গর্ব করে’।

আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত মার্কিন কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রী তেঞ্জিম দোরজি তাঁর মন্তব্যে বলেছেন যে, “ভারত একটি উন্মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা এবং সেখানে প্রাণবন্ত গণতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থা রয়েছে”। এই কমিশন বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতার অবমাননা সংক্রান্ত রিপোর্ট নিয়মিতভাবে পেশ করে। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল নির্বাচনী বৈশিষ্টের প্রেক্ষিতে এই রিপোর্টের লক্ষ্য হল তার অভ্যন্তরীণ সমর্থন বেস। গত বছর মার্কিন উপ-রাষ্ট্রপতি মাইক পেন্স ওয়াশিংটন ডি সি তে ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে মন্ত্রীদের উদ্দেশে তাঁর প্রথম ভাষণে বলেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হল ধর্মীয় স্বাধীনতা। তাতে ধর্মীয় স্বাধীনতার সম্মুখিন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা যাই হোক না কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই তাদের বিরুদ্ধাচারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং সমর্থকদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। এই সব প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরোধীদের নিন্দা করে অথচ নিজের দেশ বা শরিক দেশগুলির অনুরুপ আচরণে তারা নীরব থেকে বস্তুতপক্ষে এই বিষয়গুলি নিয়েই বিদ্রুপ ও উপহাসের খেলায় মেতে ওঠে। আন্তর্জাতি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংক্রান্ত মুনাফাবিহীন সংস্থা ফ্রিডম হাউস বিভিন্ন দেশকে ‘মুক্ত’, ‘আংশিক মুক্ত’ এবং ‘মুক্ত নয়’ বলে যে শ্রেণীবিন্যাস করে তাতে ভারতকে সেই সব দেশের শ্রেণীভুক্ত করা হয় যাদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার রেকর্ড ভালো নয়। কয়েক বছর আগে প্রকাশিত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংক্রান্ত সূচক নিঃসন্দেহে হাস্যকর। এই সব মিথ্যা এবং কপটতাপূর্ণ রিপোর্টের বিষয়ে গুরুত্ব দেবার কোনো প্রয়োজন নেই।

মজার ব্যপার হল, যে ট্রাম্প প্রশাসন অন্য দেশের গণতান্ত্রিক এবং মানবাধিকার নিয়ে বিচার করতে বসে, ফ্রিডম হাউস রিপোর্টে এখন তারাই বিচারের কাঠগড়ায়। এতে বলা হয়েছে, বিশ্ব মানের নিরিখে আমেরিকার গণতন্ত্র মজবুত হলেও আইনের অনুশাসন, বাস্তব ঘটনা ভিত্তিক সাংবাদিকতা, এবং গণতন্ত্রের অন্যান্য নীতি-নিয়মের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের বারংবার আক্রমণের ফলে তা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফ্রিডম হাউস সাবধান করে দিয়েছে যে মার্কিন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির নমনীয়তার প্রতি এই ধরণের আঘাত চলতে পারে না।

আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত মার্কিন কমিশন ২০০৯ সাল থেকে ভারতকে নিরীক্ষণের তালিকায় রেখেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রক শুরু থেকেই এই রিপোর্টকে খারিজ করে দিয়েছে। ২০১৫ এবং ২০১৬ সালেও তারা এই অভিযোগ নস্যাৎ করে দেয়। এমনকি ভারত সফরের সময় রাষ্ট্রপতি ওবামাও ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত ভারতের রেকর্ডকে চ্যালেঞ্জ জানান।

কোনো দেশই সম্ভবত এমন দাবি করতে পারে না যে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি হয় না। তবে ভারতে এক প্রাণচঞ্চল গণতন্ত্র রয়েছে এবং রয়েছে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রক সহ বিভিন্ন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে অনেকেরই হয়তো আইন বলবতের ক্ষমতা নেই কিন্তু তদন্তের আদেশ দেবার ক্ষমতা রয়েছে।

সকলেই বলে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ঠিকমত উপলব্ধি করতে পারে না। এই ধরণের অপ্রয়োজনীয় রিপোর্ট কোনো কাজের নয় কারণ এগুলিকে ভারতের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং বিকৃত বলে দেখা হয়। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির অধিকারের সাংবিধানিক গ্যারান্টি রয়েছে এবং তা ভারতের সংবিধানের মাধ্যমে সুরক্ষিত। অনেক দেশই তাদের নাগরিকদের এই অধিকার দেয় নি। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী একবার বলেছিলেন, “কেউই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না”। ((মূল রচনাঃ ড.অশ নারায়ন রায়)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?