পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট

অভাবনীয় মুদ্রাস্ফীতির দরুণ পাকিস্তানের অর্থনীতি প্রবল সংকটের সম্মুখীন। এই পরিস্থিতির ফলে সেখানে জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সঞ্চার হচ্ছে। খুব শীঘ্রই মুদ্রাস্ফীতির হার দুই অঙ্কে পৌঁছবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খাদ্য ও জ্বালানি মূল্যের অত্যধিক বৃদ্ধি এর মূল কারণ এবং এর প্রভাব অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর ওপরেও পড়ছে। পাকিস্তানের আমদানির পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৮ বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ অর্থে মাত্র দুমাস চলতে পারে বলে অনুমান। ডলারের বিনিময়ে পাকিস্তানি টাকার মূল্য হ্রাস পেয়ে ডলার পিছু দেড়শো টাকা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৩ বছরে পাকিস্তানি টাকার মূল্যমান ২০ বার কমেছে।

পাকিস্তানকে জ্বালানি সহ অন্যান্য অত্যাশ্যক পণ্য সামগ্রীর মোট চাহিদার বেশীটাই আমদানি করতে হয়। প্রবল মুদ্রাস্ফীতির দরুণ জনগণের আয়ও অর্ধেকের বেশী হ্রাস পাওয়ায় দেশ জুড়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। পেশওয়ার ও অন্যান্য স্থানে জামাত-এ ইসলামির নেতৃত্বে ইমরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন হচ্ছে। এদিকে, ইমরান সরকার কর্মসংস্থান, দারিদ্র দূরীকরণ এবং ইসলামীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে।

এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা ততটা আশাপ্রদ নয়। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল – IMF’এর কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার পরও পাকিস্তান সরকার দেশের আর্থিক দূরবস্থার বিষয়ে জনগণকে অবগত করে নি। IMF কঠোর শর্ত সাপেক্ষে পাকিস্তানকে আগামী ৩ বছরে ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। IMF’এর শর্ত পূরণ করতে পাকিস্তানকে আগামী বাজেটে অন্ততঃ ৪০ শতাংশ রাজস্ব আদায়ের সংস্থান রাখতে হবে। এর অর্থ হল, পুণরায় করের হার এবং করের পরিধি বাড়াতে হবে। যার ফলে জনগণকে আরো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী এবং চীনের মতো বন্ধু রাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তাতেও এই আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় নি। তবে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমীরশাহী বিনিয়োগ এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ঋণদানের বিরোধিতা করায় আশঙ্কা আরো বেড়েছে। ওয়াশিংটনের আশংকা, ঐ ঋণের অর্থে পাকিস্তান চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের জন্য চীনের কাছ থেকে পাওয়া ঋণ পরিশোধ করবে। ইমরান সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর শর্ত মেনে নিয়ে চীন ও IMF’এর কাছে দেশকে বন্ধক রাখার অভিযোগ উঠছে।

সন্ত্রাসে অর্থ সহায়তার মোকাবিলায় অর্থনৈতিক নজরদারি কমিটি – FATF পাকিস্তানকে তাদের ‘ধূসর তালিকা’ভূক্ত করেছে। সন্ত্রাসবাদীদের অর্থ সহায়তা বন্ধ করতে পাকিস্তান ব্যর্থ বলেই এই পদক্ষেপ। কালো তালিকাভূক্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। এই সব কিছু ফলে সেদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। কালো তালিকাভূক্ত হলে অন্যান্য দেশ বা আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে।

IMF জানিয়েছে, পাকিস্তানের আর্থিক বিকাশের হার চলতি বছরে ২.৮ শতাংশ হবে যা নেপাল ও বাংলাদেশের থেকেও কম। উল্লেখ্য, চলতি বছরে নেপালের আর্থিক বিকাশের হার ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ৭.৫ শতাংশ হবে বলে IMF জানিয়েছে। ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধির হার ৭.৬ শতাংশ হবে বলেও জানানো হয়েছে। পাকিস্তান সরকারকে অর্থনীতির হাল ফেরাতে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। অন্যদিকে থর এলাকায় পর পর ৪ বছর খরা চলতে থাকায় পরিস্থিতি আরো সংকটজনক হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তানের অন্যতম লেখক ও সাংবাদিক ইমদাদ জাফর এই বিপর্যয়কে স্বেচ্ছাকৃত আখ্যা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মহল পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং সেদেশের বিকাশের কথা বলে এসেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান দেশের কৃষি, শিল্প, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। এর থেকে বেশী পরিহাস আর কিছু হতে পারে না।



(মূল রচনা – অশোক হান্ডু)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?