ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংকট কূটনৈতিকভাবে নিরসনের প্রয়োজনীয়তা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সংকট ক্রমশঃ ঘনীভূত হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ১৯৭৯’এ ইরানের বিপ্লবের সময় থেকেই এই সংকটের সূত্রপাত বলা যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে, মূলত গত বছর থেকে, এই সংকট তীব্র হয়ে ওঠে; যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌথ সর্বাত্মক কর্মপরিকল্পনা বা JCPOA থেকে সরে আসার কথা ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করে যা এর আগে তুলে নেওয়া হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাধিক নতুন ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড কোর এবং ইরানের প্রধান নেতৃত্বের বিষয়টি।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে প্রচার অভিযানের সময় থেকেই এ বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরো আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেন। ইরানের আঞ্চলিক ক্ষেত্রে গতিবিধি খর্ব করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই নীতি মূল কথা হল, ইরানের ওপর যতটা বেশী সম্ভব চাপ সৃষ্টি করা, যাতে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুনভাবে পরমাণু চুক্তি করতে বাধ্য হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। যুদ্ধ বিমান বহনকারী যান ছাড়াও বি-৫২ বোমারু বিমান ও এক হাজার অতিরিক্ত মার্কিন বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

মার্কিন পদক্ষেপের জবাবে ইরানও একই ধরণের পদক্ষেপ নেয়, যার ফলে উভয় দেশের মধ্যে সংকট আরো ঘনীভূত হয়। ইরান JCPOA’য় তাদের একাধিক দায়বদ্ধতা থেকে সরে আসার কথা ঘোষণা করে। এর মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম রপ্তানি বন্ধ এবং ইউরেনিয়াম উত্তোলনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে দায়বদ্ধতা সমূহ। JCPOA এগুলি নির্ধারণ করেছিল। ইরান জানায়, অর্থনৈতিক লাভের কথা বিবেচনা করেই এই দুই ক্ষেত্রে তাদের কাজকর্ম সীমিত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল; এই চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরে দাঁড়ানোয় তা বাস্তবয়িত হয় নি। এদিকে JCPOA’র অন্তর্ভূক্ত অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলি এই চুক্তি কার্যকর করতে ইরানকে অবিলম্বে JCPOA’র নির্ধারিত নীতি অনুসরণের আর্জি জানিয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে আরো একাধিক ঘটনা ঘটেছে যা এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। ওমান উপসাগরে তেলের ট্যাঙ্কারের ওপর একাধিক হামলা, পারস্য উপসাগরে মার্কিন ড্রোনের লক্ষ্য করে ইরানের হামলা, ব্রিটিশ বাহিনীর জিব্রালটারে ইরানী তেলের ট্যাঙ্কার আটক এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের হুঁশিয়ারি।

অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ হওয়ার এই পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী সমস্ত জাহাজের নিরাপত্তার জন্য তা যথেষ্ট আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠতে পারে কারণ সমুদ্রপথে তেল বহনকারী বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ জাহাজ এই পথেই যাতায়াত করে।

সুতরাং বিশ্ব শক্তিগুলিকে এখন এই সংকট নিরসনে কূটনৈতিক প্রয়াস চালাতে হবে।

ভারত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল আমদানিকারী অন্যতম দেশ। এই জন্য এই অঞ্চল ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ অঞ্চলে যেকোনো ধরণের উত্তেজনার ফলে ভারতের হাইড্রোকার্বন আমদানি ব্যহত হতে পারে যার প্রতিকূল প্রভাব পড়বে দেশের শক্তি নিরাপত্তার ওপর। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে উত্তেজনার প্রেক্ষিতে পারস্য ও ওমান উপসাগর দিয়ে ভারতীয় জাহাজগুলির নিরাপদ চলাচল সুনিশ্চিত করতে ভারত ইতিপূর্বেই ওমান উপসাগরে সামরিক তরী INS চেন্নাই ও সুনয়না মোতায়েন করেছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে ভারতের যথেষ্ট ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে যেকোনো ধরণের উত্তেজনা ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী। এই সংকট সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার আগেই শান্তিপূর্ণ উপায়ে এর সমাধানের লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

(মূল রচনাঃ ডঃ আসিফ শুজা)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?