পাকিস্তানে গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ

পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে তিক্ত-মধুর সম্পর্ক চিরকালীন ও তাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক লক্ষণ। স্পন্দনশীল ও মুক্ত এক সংবাদমাধ্যমের আপাত অস্তিত্বের আড়ালে, বিশেষ করে প্রেস সবসময়েই অপ্রীতিকর বহু কিছুর ঝক্কি সামলায়। আসল বিষয় হল সংবাদমাধ্যমের কন্ঠ রোধ করা কেবলমাত্র পাকিস্তানে সামরিক শাসনকালেই সীমিত ছিল তা নয়। পরপর অসামরিক প্রশাসনও গণমাধ্যমের ওপর এই বজ্র কঠিন পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করে নি। ইমরান খান সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশ হল দোষী বা বিচারাধীন বন্দী হিসেবে রয়েছেন এমন রাজনীতিবিদের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা যাবে না এবং পাকিস্তানের বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে তাদের ‘দায়িত্ব’ পালন করার নির্দেশ দিয়েছে। 

এর আগে টেলিভিশনের সংবাদ চ্যানেল- চ্যানেল 24 , আবতক নিউজ এবং ক্যাপিটাল টিভিকে দেশে সম্প্রচার করা থেকে বিরত করা হয়। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের কন্যা মারিয়াম নওয়াজের বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার সম্প্রচারের পরেই এই সব চ্যানেলগুলিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সাক্ষাৎকারে মারিয়ম প্রামান্য ভিডিও দেখিয়ে অভিযোগ আনেন যে তাঁর পিতাকে যে বিচারক দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছেন, তাঁকে একবছর আগে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল। ঐ বিচারক সেই দাবি যদিও এখনও পর্যন্ত অস্বীকার করেন। পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রক এই সব সংবাদ চ্যানেলগুলিকে সেই সাংবাদিক সম্মেলন সরাসরি সম্প্রচার করার জন্য নোটিশ জারি করে। পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে এই সব চ্যানেল কিছু টেকনিকাল কারণে তাদের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে পারছে না ; যদিও অন্যরা এই বিষয়টিকে সেন্সারশিপ বলেই মনে করছে। 

এই প্রসঙ্গে এটি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, পাকিস্তানের বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের আইনি ব্যবস্থাপনা সাধারণভাবে কিছু বিষয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে থাকে এবং কখনোই তা কিছু ব্যক্তির করা মন্তব্য বা তার কভারেজকে নিষিদ্ধ করে না। পাকিস্তানের বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের আইনের অধিকাংশই হল লাইসেন্স প্রাপ্ত চ্যানেলগুলির বিষয়বস্তু যেন অশ্লীল না হয়, ঐস্লামিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যেন না হয়, ঘৃণায় যেন প্ররোচনা না দেয়, হিংসাকে সমর্থন যেন না করে এবং বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর সমালোচনা যেন না করা হয় তা সুনিশ্চিত করা। সংবাদ মাধ্যমে কোনো বিচারাধীন বিষয়ের আলোচনা করতে দেওয়া না হলেও, বিষয় বিশ্লেষণমূলক বা সত্য হলেও কোনো বিচারাধীন রাজনীতিবিদ বা দোষী রাজনীতিবিদের বিষয়ে কোনো অনুষ্ঠান সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা সংবাদমাধ্যমের বাকস্বাধীনতার অধিকার ও জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের পরিপন্থী। 

গত বছরে, সাংবাদিক ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলিকে কর্তৃপক্ষ বারে বারে বাধা দিয়েছে এবং শাসক দলের বা দেশের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরোধী কোনো বিষয় মুদ্রণ মাধ্যম বা সংবাদ পরিষেবায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেশের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী তাদের নীতির পক্ষে নয় এমন বিষয়ের সম্প্রচার বন্ধ করার জন্য চাপ দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের স্থান পাকিস্তানে ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের জন্য এই দেশ প্রায়শই বিপদজনক দেশের তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে এবং এদেশের সাংবাদিকদের প্রায়শই সরকার বা সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন না জানালে আটক করা হয় বা তাদের মারধর করা হয় এবং এমনকি মেরে ফেলাও হয়। এটা কেবল সেদেশের পীড়নকারী গোষ্ঠীই এই সব করে তা নয়, সোশ্যাল মিডিয়াকেও সাংবাদিকদের ভীতি প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা এই সবের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠাচ্ছেন তাদের থামিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। পাকিস্তানে এখনও বেশ কয়েকটি স্বাধীন সংবাদ চ্যানেল রয়েছে এবং একারণে পাকিস্তানের জনগণকে কোনো এক দিশায় ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ, সাধারণ নাগরিক এখন এক নিজস্ব চিন্তাভাবনা করছে এবং তারা সরকারি বিবৃতিকে আপ্তবাক্য বলে মেনে নিচ্ছেন না।

গত কয়েক দশকে পাকিস্তানের সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উপগ্রহ ও সম্পচার প্রযুক্তি ও পরবর্তী নিয়মাবলী সাংবাদিকতাকে এক বিশেষ ২৪ ঘন্টার সংবাদ বা বলা যেতে পারে ব্রেকিং নিউজে পর্যবসিত করেছে এবং এটাকেই সাধারণভাবে সংবাদমাধ্যম বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে, ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলি আলোচনা ও বিতর্কের এক নতুন ক্ষেত্র খুলে দিয়েছে। যদিও এই ধরণের অগ্রগতিকে স্বাধীনতা অর্জন বললে ভুল বলা হবে। রাজনৈতিক দিক থেকে জনগণের সামনে বক্তৃতা, সাংবাদিকতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনটা বলা উচিত হবে ও কোনটা হবে না এই বিষয়ে কোনো সূক্ষ্ম নির্দেশিকা থাকলেও, সদর্থে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে না। 

[মূল রচনা- ডক্টর স্মিতা]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?