নিরাপত্তা সহযোগিতা সুদৃঢ় করেছে ভারত ও উজবেকিস্তান

সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়ে ভারত ও উজবেকিস্তানের অষ্টম যৌথ কর্মীগোষ্ঠীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নতুন দিল্লীতে। দুই দেশের পদস্থ আধিকারিকরা এই বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। উভয় দেশের অংশগ্রহণকারীরা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের সীমান্ত পারের সন্ত্রাস ও সক্রিয় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির এবং বিশ্বের অন্য অংশে সক্রিয় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির বিষয়ে আলোচনা করেন। সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, মৌলবাদের মোকাবিলা, সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহযোগিতা বন্ধ করা, জঙ্গী কার্যকলাপের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়ে তাদের মধ্যে মত বিনিময় হয়। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আস্থা তৈরি এবং একটি উন্নত অনুশীলনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে মজবুত করার বিষয়েও আধিকারিকদের মধ্যে আলোচনা হয়।

এই বৈঠকে, রাষ্ট্র সঙ্ঘ, সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কাঠামো এবং অর্থ পাচার এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তা প্রতিহত করার জন্য ইউরোশিয়ান গোষ্ঠী সহ বহুপাক্ষিক মঞ্চের মধ্য সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়। ২০১৭ সাল থেকে ভারত সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের পূর্নাঙ্গ সদস্য এবং ১৯তম সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের শীর্ষ সম্মেলনটি গত মাসে হয়েছিল কিরগিজস্তানের বিশকেকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের শীর্ষ সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে বলেন যে, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ দমন পরিকাঠামোর সক্ষমতা কার্যকরীভাবে বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

নিরাপত্তা সহযোগিতার সঙ্গে সঙ্গে, ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। উভয় দেশেরই রয়েছে এক সমৃদ্ধ সভ্যতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বর্তমানে এই দুই দেশ তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বাড়াতে ও মজবুত করার দিশায় কাজ করছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৫য় তাঁর মধ্য এশিয়া সফরের সময় উজবেকিস্তানে গিয়েছিলেন। উজবেকিস্তানের রাষ্ট্রপতি শাওকত মিরজিওয়েভ ২০১৮র অক্টোবর থেকে দুবার ভারত সফরে আসেন। তাঁর সফরও মূলত দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ের সহযোগিতার লক্ষ্যেই ছিল। ২০১৮র ৩০শে সেপ্টেম্বর থেকে পয়লা অক্টোবর পর্যন্ত তিনি প্রথম ভারত সফর করেন এবং পরে স্পন্দনশীল গুজরাট শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে ২০১৯ এর জানুয়ারি মাসে তিনি আবার ভারত সফরে আসেন। এই সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে ভারত সফরে এসেছিল এক উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিনিধি দল।

জনতত্ত্ব ও ভৌগলিক পরিস্থিতির কারণে মধ্য এশিয়ায় উজবেকিস্তানের বিশিষ্ট অবস্থান রয়েছে। উজবেকিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লক্ষ যা ঐ অঞ্চলের মধ্যে সবথেকে বেশি। মধ্য এশিয়া হল স্থলবেষ্টিত অঞ্চল এবং উজবেকিস্তান এই অঞ্চলের মধ্যস্থলে অবস্থিত এবং উজবেকিস্তানের রয়েছে আফগানিস্তান সহ ঐ অঞ্চলের প্রায় সবকটি দেশের সীমান্ত। উজবেকিস্তান হল ভারতের কৌশলগত অংশীদার এবং মধ্য এশিয়া অঞ্চলের সঙ্গে নতুন দিল্লীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে উজবেকিস্তান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঐ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য আফগানিস্তানের শান্তি ও স্থিতিশীলতার তাৎপর্যকে ভারত ও উজবেকিস্তান গুরুত্বের সঙ্গেই দেখে। উজবেকিস্তানই হল প্রথম দেশ যারা এই বছরের জানুয়ারি মাসে সমরকন্দে ভারত-মধ্য এশিয়া বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার আয়োজন করেছিল।

মজবুত রাজনৈতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধি হলেও ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ততটা হয় নি। ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে বাণিজ্যের পরিমান ছিল ৩২৮.১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে পূর্ববর্তী বছরগুলির তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বাণিজ্যের পরিমান ৪০ শতাংশ এবং ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। দুই দেশ ২০২০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমান ১ বিলিয়ন ডলার করার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে।


উজবেকিস্তানকে ভারত ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে এবং দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। উজবেকিস্তান তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং তথ্য প্রযুক্তি, শিক্ষা, ফার্মাসিউটিক্যাল, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, কৃষি-বাণিজ্য এবং পর্যটন ক্ষেত্রে ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করার প্রয়াস চালাচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক কাজকর্ম বিঘ্নিত হচ্ছে কেবলমাত্র কোনো সড়ক বা সমুদ্রপথে সরাসরি যোগাযোগের অভাব থাকার কারণেই। ভারত ও উজবেকিস্তান বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্রয়াসের মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছে। ভারত আশগাবাদ করিডোর চুক্তিতে উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, ওমান ও ইরানকে সংযুক্ত করেছে। ভারত ইরানের ছাবাহার বন্দরেও বিনিয়োগ করছে। এছাড়াও, বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডোর প্রয়াসও আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগকে আরও সহজ করে তুলতে পারে। 
 [মূল রচনা- ডক্টর আথার জাফর]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?