শ্রীলংকায় ভারতের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ

ভারত ও শ্রীলংকা মাহো থেকে ওমান্থাই পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলওয়ে ট্র্যাক উন্নয়নের জন্য ৯১.২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ১০০ বছরে এই প্রথম এই রেললাইনের উন্নতি হচ্ছে, সেই দৃষ্টিতে এই চুক্তি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রীলংকায় রেলপথ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের অবদান সর্বজনবিদিত এবং এপর্যন্ত নতুন দিল্লী এই দ্বীপ রাষ্ট্রের রেলের বিকাশে ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায় যে ভারত তাদের বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী এবং তারা তৃতীয় দেশগুলির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত রেখেছে। ভারতের গৃহীত এই সব প্রকল্প জনমুখী এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সংযোগ বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে। এই মাসেই গামপাহা জেলায় ভারতীয় সহায়তায় ১০০টি আদর্শ গ্রামের উদ্বোধন করা হয়। ভারত শ্রীলংকায় এই ধরণের যে ২৪০০ গ্রাম নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এই গ্রামগুলি তারই অংগ। এছাড়াও ভারত শ্রীলংকায় ৬০,০০০ গৃহ নির্মাণের কাজ করছে। আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল শ্রীলংকায় এ্যাম্বুলেন্স পরিষেবায় ভারতের যোগদান রয়েছে এবং শ্রীলংকার জনগণ তার প্রশংসা করে।

এই সবই হল ভারতের সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ দিক। শ্রীলংকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি উত্তাল হলেও ভারতীয় সহায়তাপ্রাপ্ত উন্নয়নী প্রকল্পগুলি বিনা বিলম্বে রুপায়িতে হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি মৈত্রীপালা সিরিসেনা এবং প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমসিংঘের মধ্যে মতপার্থক্যের দরুণ শ্রীলংকায় আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং রাজনৈতিক বিশৃংখলা নিয়ে সেদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের শেষ নেই। ইস্টার সান্ডের আক্রমণ শ্রীলংকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করিয়েছে। ভারত খুব সতর্কতার সঙ্গে সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলে এবং সাংবিধানিক উপায়ে মত পার্থক্য দূর করার জন্য শ্রীলংকা নেতৃত্বকে পরামর্শ দেয়। নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলার জন্য সমবেত প্রয়াস চালানোর কথা বলেছে।

ভারত বন্দরের মত কৌশলগত ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ভারত, জাপান এবং শ্রীলংকা কলম্বো বিমান বন্দরে ইস্ট কন্টেইনার টার্মিনাল সম্মিলিতভাবে বিকশিত করতে একমত হয়েছে। এই অঞ্চলে চীনের ক্রমাগত হস্তক্ষেপ ঠেকাতে এই যৌথ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পেইচিং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাম্বান্টোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লীজ নিয়েছে।

২০১৯এর এপ্রিলে বেল্ট এবং রোড ইনিয়েশিয়েটিভ বি আর আই এর আওতায় শ্রীলংকায় চীনের প্রথম বিনিয়োগ হিসেবে হাম্বান্টোটায় মাতারা এবং বেলিয়াট্টার মধ্যে সংযোগকারী নতুন লেললাইন চালু করা হয়।

ভারত ৪৫.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তায় উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশে কাংকেশনথুরাই হারবার বিকশিত করছে। ২০১৯এর মার্চে হাম্বান্টোটার কাচাহে একটি তেল শোধনাগারের শিলান্যাস করা হয়। শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী হাম্বান্টোটায় বহুজাতিক বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন। ভারত ত্রিংকোমালী হারবার এবং মাটালা বিমান বন্দরের উন্নয়নে আগ্রহী।

জ্বালানী এবং সংযোগের ক্ষেত্রে দুটি দেশ সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারত ও শ্রীলংকার মন্ধ্যে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সহযোগিতা সংক্রান্ত যৌথ কর্মী গোষ্ঠীর চতুর্থ বৈঠক ২০১৯এর জুনে অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ত্রিংকোমালীর কাছে সামপুরে একটি সৌর শক্তি প্রকল্প এবং কেরাওয়ালাপিটিয়ায় একটি এল এন জি প্রকল্পের পর্যালোচনা করা হয়।

জনগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং কাংকেশনথুরাই ও পুডুচেরীর কাছে কারাইকার বন্দরের মধ্যে ফেরি সার্ভিসের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কারণে সংযোগ নিয়ে সমস্যার বিষয়টি দীর্ঘ দিনের পুরনো। ভারতের সহায়তার কাংকেশনথুরাই হারবারের উন্নয়নের ফলে দুটি দেশের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। এর ফলে বাণিজ্য এবং পর্যটন বৃদ্ধি পাবে।

এই সব ঘটনাবলী শ্রীলংকার সঙ্গে ভারতের সহযোগিতার বৈচিত্রের ইঙ্গিত বহন করে তবে ভারত মহাসাগরে ভারতের কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। (মূল রচনাঃ ডঃ এম সামন্ত)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?