ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্র অভিযান শুরু হল

সোমবার বিকেলে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির এক অন্যতম জটিল এবং উচ্চাকাংখ্যামূলক অভিযানের সূচনা হল। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রেকেট জি এস এল ভি মেক-III ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্র অভিযান চন্দ্রাযান ২ কে নিয়ে গতকাল বেলা ২টো ৪৩ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায় সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। ঠিক ১৭ মিনিট পর চন্দ্রযান ২ পৃথিবীর পূর্বনির্ধারিত স্থানান্তর কক্ষপথে স্থাপিত হয়।

প্রথমে এই উড়ান নির্ধারিত ছিল ১৫ই জুলাই, তবে কারিগরি কিছু সমস্যার দরুণ সেটি বাতিল করা হয়। এটি মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কৃতিত্ব যে তারা স্বল্প সময়ের মধ্যে সেই ত্রুটি খুঁজে বার করে তা দূর করেছেন।

উল্লেখ করা যায় যে নির্ভুল উৎক্ষেপণ এই মিশনের প্রথম পদক্ষেপ যা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর এযাবৎকালের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলির মধ্যে সবচেয়ে জটিল। চন্দ্রযান-২এর চাঁদে পৌছোতে এবং সেখানে অবতরণ করতে ৪৮দিন সময় লাগবে, আর এই অবতরণের দিন নির্ধারিত হয়েছে ৭ই সেপ্টেম্বর।

ভারতের প্রথম চন্দ্র অভিযান চন্দ্রযান ১ ছিল শুধুমাত্র একটি কক্ষপথ মিশন, কিন্তু এই দ্বিতীয় মিশন অধিকতর কঠিন। এতে রয়েছে তিনটি উপকরণ-অরবিটর, ল্যান্ডার এবং রোভার। চন্দ্রের ওপর থেকে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে এই উপগ্রহের সমীক্ষা করতে এগুলি এক সঙ্গে কাজ করবে। চন্দ্রযান ২এর ল্যান্ডারের নামকরণ করা হয়েছে ভারতীয় বিজ্ঞানী বিক্রম সরাভাই এর নামে “বিক্রম”। তাঁকে ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচির জনক বলে বিবেচনা করা হয়। রোভারের নাম প্রজ্ঞান, যার সংস্কৃত অর্থ হল জ্ঞান। ১০০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে অরবিটর ম্যাপিং এর কাজ করবে এবং ল্যান্ডার হাল্কাভাবে অবতরণ করবে এবং রোভারকে চন্দ্র পৃষ্ঠ অনুসন্ধানের কাজে পাঠাবে।

মৌলিকভাবে এক চুক্তির আওতায় রাশিয়ার রোভার দেওয়ার কথা ছিল, তবে তারা কথা না রাখায় ইসরোকে এর নকশা তৈরি এবং এটি নির্মাণ করতে হয়। চন্দ্রযান ২ সম্পূর্ণভাবেই একটি ভারতীয় মিশন।

চন্দ্রযান ২তে ১৩টি ভারতীয় পেলোড রয়েছে-৮টি অরবিটরে, ৩টি ল্যান্ডারে এবং দুটি রোভারে। এগুলির কাজ হল চন্দ্রের গবেষণা

করা। ল্যান্ডারে রয়েছে একটি নাসা লেজর রিফ্লেক্টর। এই মিশনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল চন্দ্র পৃষ্ঠে হাল্কাভাবে অবতরণের সক্ষমতা প্রদর্শন করা এবং একটি রোবোটচালিত রোভার পরিচালন করা।

চন্দ্রযান ২ এর ল্যান্ডারের অবতরণ স্থল নির্বাচন করা হয়েছে দক্ষিণ মেরুর ৬০০ কিলোমিটার উচ্চতায় দুটি গর্তের মধ্যবর্তী সমতল ক্ষেত্র। এই স্থানটি বিষুবরেখার সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চল যা এখন পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করতে পারে নি। সেই জন্য এইটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। চাঁদের মেরু অঞ্চল বিজ্ঞানীদের কাছে খুবই আগ্রহের বিষয় কারণ সেখানে প্রচুর জলীয় বরফ রয়েছে ।

সোমবারের উৎক্ষেপণের পর চন্দ্রযান ২ কে পৃথিবীর অত্যন্ত সম্প্রসারিত কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এটি চন্দ্রের মাধ্যাকর্ষন ক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হয়ে চাঁদের ১০০ কিলোমিটার উচ্চতায় সার্কুলার পোলার অরবিটে স্থাপিত হবে। এই মহাকাশযান ২৭দিন চন্দ্রের কক্ষপথে অতিবাহিত করবে এবং তারপর ল্যান্ড-রোভারকে ছাড়বে এবং ধীরে ধীরে সেটি চন্দ্রপৃষ্ঠের ৩০ কিলোমিটার কক্ষপথে অবতরণ করবে।

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ল্যান্ডার আরো নেমে গিয়ে রেট্রোরকেটের সহায়তায় চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করবে। এই হাল্কা অবতরণে সময় লাগবে প্রায় ১৫ মিনিট। ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবান একে মিশনের সবচেয়ে ভয়ংকর মূহুর্ত বলে বর্ণনা করেছেন।

সব কিছু ঠিক থাকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের পর ভারত হবে চতুর্থ দেশ যাদের কোনো যান চন্দ্রে অবতরণ করবে।

অবতরণের পর রোভার ল্যান্ডার থেকে বেরিয়ে এসে এক চন্দ্র দিবস ধরে চন্দ্র পৃষ্ঠে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাবে। এই এক চন্দ্র দিবস হল ১৪ পৃত্থ্বি দিবসের সমান। অরবিটর এক বছর ধরে তার মিশন অব্যাহত রাখবে।

ইসরো উল্লেখ করেছে যে চন্দ্রে অবতরণের মিশনের সাফল্যের হার ৫০ শতাংশের কম। তবে ইসরোর সাফল্যের হারের নিরিখে বিশেষ করে ২০০৮এ চন্দ্রযান ১ এবং ২০১৩র মঙ্গল অরবিটর মিশনের প্রেক্ষিতে চন্দ্রযান ২ এর সাফল্য তাদের মুকুটে আর একটি পালক সংযোজন করবে বলে আশা করা যায়। (মূল রচনাঃ বিমান বসু)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?