ট্রাম্পের আচরণে আবার সবাই হতচকিত

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে বৈঠকে দাবি করেছেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি কাশ্মীর প্রশ্নটির নিষ্পত্তির জন্য তাঁকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের অনুরোধ করেছেন। তবে ইতিমধ্যে মার্কিন বিদেশ বিভাগ জানিয়েছে, ওয়াশিংটন কাশ্মীর বিষয়ে কোনও ভূমিকা পালনে আগ্রহী নয়,এবং বিষয়টি একান্তই ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বিষয়। মার্কিন রাষ্ট্রপতির এই দাবির তাৎপর্য খতিয়ে দেখতে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের মধ্যে কৌশলগত যে কোনও আলোচনার প্রতি নতুন দিল্লির তীক্ষ্ণ নজর রাখা প্রয়োজন।

মার্কিন রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শংকর স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন রাষ্ট্রপতির কাছে কখনই এই ধরণের কোনও অনুরোধ জানান নি।

তিনি বলেন, প্রকৃত তথ্য হল, গত মাসে জাপানে অনুষ্ঠিত G-20 শিখর সম্মেলনের অবসরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে এক বৈঠক হয়। তিনি আরও জানান, আগামী দিনেও রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ সভার অধিবেশনের ফাঁকে ওয়াশিংটনে দুই নেতার মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া, দ্বিপাক্ষিক আলাপ আলোচনার জন্য কিছু দিনের মধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ভারত সফরে আসতে পারেন।

এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি আইন প্রণয়ন করে NATO গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির ন্যায় ভারতকেও সে দেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগী দেশ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। অন্য দিকেও দুটি দেশ আফগানিস্তান প্রসঙ্গে ধারাবাহিক আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও দুটি দেশের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তিও হতে চলেছে। এই সমগ্র ঘটনাক্রমের প্রেক্ষিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন পূর্ববর্তী সব রাষ্ট্রপতির নেওয়া অবস্থান থেকে সরে এসে কাশ্মীর প্রশ্নটিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালনের প্রস্তাব দিলেন, তা প্রকৃতই বিভ্রান্তিকর। বিশেষজ্ঞগণ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন এতদিন পর্যন্ত অনুসৃত ওয়াশিংটনের কূটনীতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন আর হয়ত কার্যকরী বলে মনে করছেন না। এদিকে ভারত সেই ১৯৭২’এর শিমলা চুক্তির সংস্থান অনুযায়ী এ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, কাশ্মীর প্রসঙ্গটি একান্তই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিষয়, এবং এ ব্যাপারে তৃতীয় কোনও পক্ষের অংশগ্রহণের প্রশ্নই ওঠে না। ফলে পাকিস্তান কাশ্মীর বিতর্কের সমাধানের প্রচেষ্টায় যখনই তৃতীয় কোনও পক্ষের অংশগ্রহণের পক্ষে সওয়াল করেছে, ভারত তা সঙ্গে সঙ্গে খারিজ করে দিয়েছে।

পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা অনুযায়ী, ভারতকে যেন কিছুটা কোণ ঠাসা করতেই ওয়াশিংটন দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামাবাদকে এক নতুন ভূমিকা পালনকারী হিসেবে দেখতে চাইছে। প্রকৃতপক্ষে ডোনাল্ড ট্রাম্প, আফগানিস্তান থেকে যত শীঘ্র সম্ভব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের স্বার্থে সে দেশের অশান্ত পরিস্থিতি সামলাতে পাকিস্তানকে একটি সম্মানজনক ভূমিকা পালনের দায়িত্ব দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

কাশ্মীর সম্পর্কে মার্কিন রাষ্ট্রপতির বিবৃতি এখন মুখ্য আলোচ্য বিষয় হলেও আমাদের মনে রাখতে হবে, বেশ কয়েক মাস ধরেই ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের মধ্যে জটিল কূটনৈতিক আলাপ আলোচনা চলছে। পাকিস্তান, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসেবে কুখ্যাত হাফিজ সঈদকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন প্রশাসনকে বোঝাতে চাইছে যে সে ওয়াশিংটনের নির্দেশ মতই কাজ করছে, কাজেই এর পুরস্কার হিসেবে সে আফগানিস্তান সহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের এক ধরণের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে, যাতে ওয়াশিংটন সায় দিয়েছে। পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর সম্পন্ন করে দেশে ফিরে এসে নতুন কি কূটনৈতিক খেলা শুরু করেন তার দিকেই এখন সকল মহলের লক্ষ্য।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথা বহির্ভূত কূটনৈতিক পদক্ষেপ করার একটা প্রবণতা রয়েছে, যার পরিচয় এর আগেও তিনি দিয়েছেন। তিনি তাঁর দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই নানা পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিচ্ছেন, কাশ্মীর সম্পর্কে তাঁর বিবৃতি তারই একটা পরিচয় বহন করছে। এরই প্রেক্ষিতে এখন ভারতকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তার নীতিকৌশলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। অপরদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুধাবন করতে হবে, পররাষ্ট্রনীতি এমন একটা বিষয় যাতে ইচ্ছামত রদবদল ঘটানো যায় না; এবং নিজ দেশের ধারাবাহিক অবস্থান থেকে সরে এসে হটাৎ কোনও বিবৃতি দেওয়া আদৌ কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পর্যায়ে পড়ে না। (মূল রচনাঃ- কল্লোল ভট্টাচার্য্য)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?