ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীঃ ব্রেক্সিট এবং ভবিষ্যৎ

২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ব্রিটেনের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেছে। টেরেসা মের ব্রেক্সিট রুপায়নে ব্যর্থ হওয়া এবং তাঁর নিজের সাংসদদের সমর্থন হারানোর পর এবছর ৪ঠা জুলাই তিনি ইস্তফার কথা ঘোষণা করেন। এর ফলে সংরক্ষণশীল দলের নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয়, তাতে বোরিস জনসন বিদায়ী বিদেশ মন্ত্রী জেরেমি হান্টকে ৪০,০০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। জয়লাভের পরেই শ্রী জনসন বলেন তাঁর অগ্রাধিকার হল ৩১শে অক্টোবরের মধ্যে ব্রেক্সিট রুপায়ণ, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা, লেবার নেতা জেরেমি কর্বিনকে পরাস্থ করা। তিনি মন্তব্য করেন যে আধুনিক ব্রিটেনের জন্য তিনি ক্যাবিনেটকে ঐক্যবদ্ধ করবেন। আর এর অধিকাংশই হবে মহিলা এবং জনগোষ্ঠীগত সংখ্যালঘু সাংসদ। 
নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্রী জনসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ইওরোপীয় সংঘের ২৭জন নেতার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ব্রেক্সিট অচলাবস্থার অবসান ঘটানো। একদিকে তিনি বিচ্ছেদ সহ বা বিচ্ছেদ ছাড়া ইউ ইউ এর বাইরে নিয়ে আসতে ব্রিটেনের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর জন্য তিনি ব্রেক্সিটের উন্নততর সুবিধা সৃষ্টির বিষয়ে আস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, এই ব্লক এটি সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন যদি তা না হয়, তবে ‘যাই হোক না কেন’ ৩১শে অক্টোবরের শেষ সময় সীমার মধ্যে ব্রিটেনকে ইউ ইউ ছাড়তে হবে। অন্যদিকে, ই ইউ এর আগে জোর দিয়ে বলে যে টেরেসা মের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল তা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় ব্রিটেনকে এই ব্লক ছাড়তে হবে। 
সংসদ এবং তাঁর দলে নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সামনে অন্য চ্যালেঞ্জ হল কোনো চুক্তি ছাড়া অধিকাংশ সংসদ সদস্য ইউ ইউ পরিত্যাগের বিরোধী। এদিকে, শ্রী জনসনের এই মরিয়া মনোভাবের দরুণ পাউন্ডের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এর অর্থ হবে কোনো রকম চুক্তি ব্যতিরেকে ব্রেক্সিট, যার ফলে অনেকেই সে দেশে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি হবে বলে আশংকা করছেন। এই ধরণের পরিস্থিতি এড়াতে শ্রী জনসন ব্রেক্সিটপন্থিদের ক্যাবিনেটে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন, এতে তার অবস্থান মজবুত হতে পারে। 
নতুন জনসন সরকারের অধীনে ভারত-ব্রিটেন সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা যায়। ২০১৭র জানুয়ারীতে ব্রিটেনের বিদেশ মন্ত্রী হিসেবে বোরিস জনসনের ভারত সফরের সময় তিনি এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ২০১৯এর মার্চে ব্রিটেন ই ইউ থেকে প্রস্থান করলে তা ইতিবাচকভাবে রুপায়িত হতো। সাম্প্রতিক অতীতে নেতৃত্বের নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভুত কনজারভেটিভ সদস্যদের সমর্থন চেয়ে চিঠি লেখার সময় তিনি বলেন যে ভারত-ব্রিটেন সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এই সম্পর্ক বাণিজ্য, পণ্য ও পরিষেবার বিনিময়ের অপেক্ষা অনেক বেশি গভীর। নতুন সরকার যে ভারত-ব্রিটেন সম্পর্ক উন্নত করতে আগ্রহী এটি তারই পরিচয় বহন করে। ভারত অভিবাসন নিয়মনীতি সহজ করার পক্ষপাতী অন্যদিকে ব্রেক্সিট বিদেশীদের পরিবর্তে অভ্যন্তরীন লোকেদের অধিক সুবিধা দিতে সংকল্পবদ্ধ। তবে শ্রী জনসন ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ব্রিটেনে আসার পথ সুগম করতে সহজতর ভিসা নিয়মের পক্ষপাতী। এছাড়া তিনি এক ন্যয্য এবং ভারসাম্যযুক্ত ব্যবস্থার পক্ষে মত পোষন করেন। 

বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে দ্বিধা বিভক্ত ব্রিটেন নানান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জনগণের মতামতকে ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে গুরুত্ব দিতে হবে। তারাই দেশের সর্বোত্তম স্বার্থের দিকটি স্থির করবেন। এই প্রসঙ্গে শ্রী জনসনের ওপর অনেক বড় দায়িত্ব রয়েছে কারণ তাকে ব্রেক্সিটের এই সমস্যা থেকে দেশকে বের করে সামাজিক-রাজনৈতিক  স্থিতিশীলতা প্রদান করতে হবে। ইওরোপীয় সংঘ থেকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সুশৃংখল প্রস্থান ব্রিটেনকে ২০১৬ থেকে চলে আসা বর্তমান অনবস্থার হাত থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। শ্রী জনসন মধ্য পন্থা বেছে নেবেন নাকি তার কঠোর অবস্থানে অনড় থাকেন, এখন ব্রিটেন সহ অন্য সকলের কাছে সেটি দেখার বিষয়। (মূল রচনাঃ ডঃ সঙ্ঘমিত্রা শর্মা)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?