বিনিয়োগ বান্ধব উন্নয়নমুখি কেন্দ্রীয় বাজেট

অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ গতকাল সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের সাধারণ বাজেট পেশ করলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দ্বিতীয় এনডিএ সরকারের এটি হল প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। আর্থিক বিশেষজ্ঞ মহল এই বাজেটকে বিনিয়োগ বান্ধব, উন্নয়ন মুখি বাজেট বলে অভিহিত করেছেন। সাধারণ মানুষও এই বাজেটকে জনকল্যাণমুখী বাজেট হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। ব্যাবসায়ী ও শিল্প মহলের প্রত্যাশা অনুযায়ী শ্রীমতী সীতারমণ এই বাজেটকে সহজে ব্যবসার একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপিত করতে চেয়েছেন; এবং এর জন্য ঢালাও সংস্থান রেখেছেন। এরই পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী ডিজিটাইজেশান কর্মসূচির প্রসারের মাধ্যমে জন সাধারণের জীবন জীবিকাকে সরল করতে চেয়েছেন। বাজেটে, ভারতীয় অর্থব্যবস্থাকে বর্তমানের তিন ট্রিলিয়ন ডলার অর্থব্যবস্থা থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থব্যবস্থা স্তরে উন্নীত করার একটি রূপরেখা রচনা করা হয়েছে; যার অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হবে সম্ভাব্য সকল উৎস থেকে যথা সম্ভব বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ। দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন ধারণের মানকে উন্নত করার লক্ষ্যে, সরকার -ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিবিড় সংযোগ সাধনের মাধ্যমে সর্বাত্মক বিকাশের পথে অর্থব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট দিশানির্দেশ দিতে চাওয়া হয়েছে এই বাজেটে।

শ্রীমতী সীতারমণ এই বাজেটে বেসরকারী সংস্থা সহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে জড়িত করে পর্যাপ্ত সম্পদ সৃষ্টির সংস্থান রাখতে চেয়েছেন, যা আর্থিক উন্নয়ণের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের কল্যাণ সাধনের পূর্বশর্ত। সরকারের এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই অর্থমন্ত্রী বছরে ৪০০ কোটি টাকা পর্যন্ত আয়কারী সংস্থার ওপর ধার্য আয়কর কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রেখেছেন। দেশের প্রায় ৯৯.৩ শতাংশ উৎপাদন সংস্থা এর আওতায় আসবে। কোম্পানী কর হ্রাসের ফলে উৎপাদন সংস্থাগুলির হাতে যে বাড়তি অর্থ থাকবে তা তারা অতিরিক্ত বিনিয়োগে কাজে লাগাতে করতে পারবে। বর্ধিত বিনিয়োগের অর্থ বর্ধিত চাহিদা, বর্ধিত উৎপাদন ও বর্ধিত কর্মসংস্থান।

পরিকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসাধনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী, রেল, সড়ক,জল ও বিমান সংযোগ পরিকাঠামো উন্নয়নের চলতি যোজনাগুলি রূপায়ণে বেসরকারী ক্ষেত্রকে অধিক মাত্রায় জড়িত করার একটি কর্মপরিকল্পনা রচনার প্রস্তাব এই বাজেটে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ কারীদের কাছে পরিকাঠামো ঋণ তহবিল-IDF’এ অধিক লগ্নীর প্রস্তাব ছাড়াও কর্পোরেট ঋণ বাজারের পরিধি বিস্তার ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য অনাবাসী ভারতীয়দের উৎসাহ দানের সংস্থান রাখা হয়েছে।

দেউলিয়া আইন প্রণয়ণের মাধ্যমে ব্যাঙ্ক ক্ষেত্রের অনাদায়ী ঋণের সমস্যা নিরসনের চেষ্টার পাশাপাশি ব্যাংকগুলির নতুন মূলধন সৃষ্টির জন্য এই বাজেটে ৭০ হাজার কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে; যা দেশে অতিরিক্ত ঋণের প্রবাহ সৃষ্টি করে আর্থিক কাজ কর্মে গতি সঞ্চারের সহায়ক হবে। অতিরিক্ত মূলধন সৃষ্টির দিশায় এই বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থার বিলগ্নীকরণের মাধ্যমে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা আয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে।

অধিক মাত্রায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ-FDI আকর্ষণের লক্ষ্যে দেশের বিমান ও প্রচারমাধ্যম শিল্পে আরও এই বিনিয়োগের প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করবে বলে বাজেটে বলা হয়েছে। বাজেটে বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ FDI ও সিঙ্গল ব্রান্ড খুচরো ব্যবসা ক্ষেত্রে FDI বিধিনিয়ম শিথিল করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বাজেটে ভূ সম্পত্তি ও পরিবহণ ক্ষেত্রে অর্থ সরবরাহকারী ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক সংস্থা- NBFC’র ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভারতের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ও মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন-GDP’র মধ্যে অনুপাত পাঁচ শতাংশের কম, যা বিশ্বের অন্য সব দেশের তুলনায় সর্বনিম্ন। বিষয়টিকে সামনে রেখেই বাজেটে অধিক বৈদেশিক ঋণ আকর্ষণের যোজনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাজেটের অন্যান্য প্রস্তাব অনুযায়ী, অতি সম্পন্ন শ্রেণির ওপর আয়কর বৃদ্ধি, এবং মেক-ইন ইন্ডিয়া কর্মসূচিকে উৎসাহ দিতে সোনা সহ বেশ কিছু পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে,আর্থিক ঘাটতির পরিমাণকে তিন শতাংশের নিচে রাখার সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক বিকাশ প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবার ওপর এই বাজেটে পর্যাপ্ত সংস্থান রাখা হয়েছে।
 (মূল রচনাঃ- জি শ্রীনিবাসন )

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?