পাকিস্তানকে উপসাগরীয় দেশগুলিও তিরস্কার


উপসাগরীয় আরব দেশগুলির কাছ থেকে পাকিস্তান যে ধরণের সমর্থন আশা করেছিল তা তারা পায় নি। ভারত তার সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখকে দুটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা দেওয়ায় এই সমস্ত দেশগুলি তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেয় নি। ভারতের উথ্বান ও এক স্থিতশীল এবং দায়িত্বশীল দেশ হিসেবে উঠে আসায় এই সব দেশগুলি এই বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে। এছাড়াও, উপসাগরীয় দেশগুলির অধিকাংশেরই সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বার্ষিক ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বাণিজ্য হয় ভারতের যা ভারতকে আরব উপসাগর অঞ্চলের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার করে তুলেছে।


বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী ঐস্লামিক রাষ্ট্র সৌদি আরব ভারতের এই অবস্থানে সংযত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে। অন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশ যেমন, কুয়েত, কাতার, বাহেরিন এবং ওমান এই বিষয়ে কোনো বিবৃতিই জারি করে নি। সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ভারতের এই সিদ্ধান্তকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করেছে। এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এর থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে তারা বিষয়টিকে লঘু করে দেখেছে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী সাম্প্রতিক অতীতে পাকিস্তানকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার স্বল্প সুদে ঋণ দিলেও এবং পাকিস্তানকে সরবরাহ করা তেলের মূল্য পরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও, কাশ্মীর প্রসঙ্গে ইসলামাবাদকে তারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে তারা অনেক বেশি মূল্য দেয়।

সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ভারতের সবথেকে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। এই বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার (ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ২ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং ভারতের আমদানি ২ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার) যা ভারতকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীকে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার (চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরে) করে তুলেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে ভারতীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেট বাজারে ভারতীয়রাই সব থেকে বড় বিদেশী বিনিয়োগকারী। নিয়মমাফিক প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণ হয়ে গেলেই দুবাইয়ের প্রথম সারির আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনকারী কাশ্মীরে একটি লজিস্টিক হাব তৈরির পরিকল্পনা করছে। ভারতে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর রাষ্ট্রদূত আহ্‌মেদ আল-বান্না কথিতভাবে বলেছেন যে, কাশ্মীরের পরিবর্তন সামাজিক ন্যায় বিচার এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে ও তার সঙ্গে স্থিতিশীলতা ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

কাশ্মীর প্রসঙ্গে সৌদি আরবও মুলত চুপ। সৌদির সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান উভয়েরই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে ঐস্লামিক বিশ্বে সর্বাধিক ক্ষমতাধর হিসেবে রিয়াধের রয়েছে তুরস্ক ও ইরানের সঙ্গে এক আদর্শগত মত পার্থক্য। কাশ্মীর প্রসঙ্গে সৌদি আরব যে বিবৃতি জারি করেছে তাতে তারা জানিয়েছে যে পরিস্থিতির ওপর তারা নজর রাখছে এবং তারা এক শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

সৌদি আরবে ২৭লক্ষ ভারতীয় বসবাস করেন এবং তারা ইরাকের পরে ভারতের সর্ববৃহৎ তেল সরবরাহকারী দেশ। ভারতে গত বছরের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের হিসাবে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির পরিমাণ ২ হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এই সপ্তাহে ভারত তাদের এপর্যন্ত অন্যতম সর্ববৃহৎ বিদেশী বিনিয়োগের কথা ঘোষণা করেছে এবং এটি হলো সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়াত্ব অ্যারামকোর দ্বারা ভারতের রিলায়েন্স অয়েল রাসায়নিক ব্যবসাটি ১হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে ক্রয়। সৌদির রাজকুমার মহম্মদ বিন সলমন ২০২১ সালের মধ্যে ভারতে ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভারতের পদক্ষেপ নিয়ে সৌদি আরব ও বাহেরিনের সঙ্গে আলোচনা করেন। কিন্তু তিনি এই দুই দেশের কাছ থেকে কোনো সমর্থন পান নি। উল্টোদিকে কাশ্মীর বিষয় নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের চেষ্টা করলে বাহেরিন বহু দক্ষিণ এশীয়কে গ্রেপ্তার করে। ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রৌহানি এবং সেদেশের বিদেশ মন্ত্রক ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি ও আলোচনার ডাক দেন।

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যদি রাষ্ট্র সঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উথ্বাপন করে তবে কে তাদের সমর্থন করবে তা নিয়েই পাকিস্তানের উদ্বেগ রয়েছে। কাশ্মীর প্রসঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলি পাকিস্তানকে সমর্থন করা থেকে পিছিয়ে এসেছে। তারা মনে করেছে যে পাকিস্তান তেল সমৃদ্ধ এই দেশগুলি থেকে অর্থ আদায় করার জন্য কাশ্মীরকে ব্যবহার করছে। কিন্তু সেই অর্থ ভুল হাতে পৌঁছচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলিও কর্মসংস্থানের অভাব ও জীবন-যাপনে অত্যধিক খরচের মতো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আরবে বিক্ষোভ কৌশলগত অঞ্চলে তাদের অভ্যন্তরীণ পুনর্বিন্যাসের পথে ঠেলে দিয়েছে। পাকিস্তান তাদের বেকারত্ব পরিস্থিতি, মূল্যবৃদ্ধি ও তাদের অর্থনীতির বেহাল অবস্থার মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যার মোকাবিলায় সচেষ্ট হলেই ভালো। কাশ্মীর বিষয় নিয়ে সহানুভূতি আদায় করা এবং বিভিন্ন দেশ থেকে কোটি কোটি ডলার গ্রহণ করে পাকিস্তান এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।

[মূল রচনা- কৌশিক রায়]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?