ইয়েমেনে শান্তি এখনও অধরা

এক গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা ক্রমে এ সপ্তাহে গৃহযুদ্ধ দীর্ণ ইয়েমেনে শান্তি ফিরে আসার এক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা, সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় আয়োজিত শান্তি আলোচনায় অংশ গ্রহণের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, ইয়েমেনের সরকারী সেনার সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা-আইদারুস-আল যুবেদি’র নেতৃত্বে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী –UAE সমর্থিত বিদ্রোহী সেনার তুমুল সংঘর্ষের পর বিদ্রোহীরা এডেনের রাষ্ট্রপতির প্রাসাদটি নিজেদের দখলে নেয়। এই সংঘর্ষে ৪০ জন নিহত ও দুই শতাধিক আহত হয়। তবে আইদারুস-আল যুবেদির বক্তব্য, আবদারাবু-মনশুর হাদি’র অনুগত বাহিনী হাউথি আন্দোলনের নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, ও সেই ষড়যন্ত্র বানচাল করতেই বিদ্রোহী সেনা রাষ্ট্রপতির প্রাসাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। এডেন শহরে দক্ষিণাঞ্চলীয় অস্থায়ী পরিষদের দপ্তরে সৌদি বিমান আক্রমণের পর বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা শান্তি আলোচনায় অংশ গ্রহণের আগ্রহের কথা ঘোষণা করেন। ইতিমধ্যে, UAE ও সৌদি আরব-দুটি দেশই ইয়েমেনের সরকার অনুগামী গোষ্ঠীগুলিকে আগামী সপ্তাহে শান্তি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে।

ইয়েমেনে দীর্ঘ দিন ধরে চলা সংঘর্ষের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, আরব স্প্রিং অভ্যুত্থানের পর ইয়েমেনে শান্তিপুর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরণ প্রক্রিয়া ব্যর্থ হবার ফলে আলি আবদুল্লা সালেহ ২০১১ সালে তাঁর সহকারী হাদি’র হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে বাধ্য হন। তার পর থেকে হাদি সরকারের সামনে নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যা, যেমন ধারাবাহিক জেহাদি হামলা, দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, দুর্নীতি, বেকারত্ব,অভাবনীয় খাদ্য সংকট ইত্যাদি মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়।এই সব সমস্যা, হাউথি অর্থাৎ শিয়া বিদ্রোহীদের সামনে দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেবার সুযোগ এনে দেয়। এদিকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সুন্নী সম্প্রদায়ের মানুষও সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে হাউথি বিদ্রোহীদের সমর্থনে এগিয়ে আসে। এই সুযোগে হাউথিরা দেশের ক্ষমতার বেশ কয়েকটি কেন্দ্রকে কব্জা করে। ক্রমে তারা গোটা দেশের ওপরেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতে থাকে।

আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ইরানের সমর্থিত এই হাউথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতায় উদ্বিগ্ন হয়ে সৌদি আরব ২০১৫ সালে হাদি সরকারকে সমর্থনের জন্য একটি জোট গঠন করে। এই জোটের শরিক হয় আরব দুনিয়ার সুন্নী রাষ্ট্রগুলি, যেমন UAE, কুয়েত, বাহারিন, কাতার, সুদান, মিশর, জর্ডন, ও মরোক্কো; আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন নানা উপকরণ দিয়ে এই জোটকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। এই জোট হাউথিদের দক্ষিণ ইয়েমেন থেকে বিতাড়িত করে দিলেও তারা তখনও রাজধানী শহর সানা’র ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সফল হয়। এর পর ২০১৭ সালে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনার জেরে রিয়াদ ইয়েমেন অবরোধে নেতৃত্ব দেয় ও বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত বন্দর শহর হোদেইদার ওপর সামরিক অভিযান চালায়।

ইয়েমেনে এইভাবে দীর্ঘ দিন চলে আসা সংকটের বলি হয় দেশের অগণিত সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে ইয়েমেনের এই পরিস্থিতিকে মানুষের সৃষ্টি করা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় বলে অভিহিত করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের দেড় কোটির মত মানুষ অনাহার পীড়িত;এর মধ্যে অন্তঃসত্তা মহিলা ও দুগ্ধ পোষ্য শিশুর সংখ্যা দশ লাখেরও বেশি।

ইয়েমেন, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী প্রণালীতে অবস্থিত হওয়ায় দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চল ছাড়াও সমগ্র বিশ্বের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকে বিতাড়িত হবার পর আল-কায়দা ও ISIS জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় স্থল হল ইয়েমেন। দেশটি, সুন্নি সৌদি আরব ও শিয়া ইরানের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে সৌদি সমর্থিত সরকারী বাহিনী ও UAE প্রশিক্ষিত সিকিউরিটি বেল্ট বাহিনী ও অপরদিকে শিয়া হাউথি বিদ্রোহী-এই দুই পক্ষের মধ্যে ক্রমাগত সংঘর্ষ চলছে। ইয়েমেন সংকটের দরুন এই অঞ্চলের প্রণালীর মধ্য দিয়ে তেল বহনকারী জাহাজগুলির সব সময়েই বিপদের আশংকা থেকে গেছে।

ভারত চায়, ইয়েমেনে যত শীঘ্র সম্ভব শান্তি ফিরে আসুক। এই দেশের সংকট ভারত-ইয়েমেন সম্পর্কের ওপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলছে। ইয়েমেন সংকটের কারণেই ২০১৫ সালে নতুন দিল্লিকে তার দূতাবাস সানা থেকে দিভুতিতে স্থানান্তর করতে ও ভারতীয়দের ওই দেশ সফরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয়। উল্লেখ্য ২০১৫ সালে ভারত, ইয়েমেনে আটকে পড়া ৪৬৪০ জন ভারতীয় ও অনান্য ৪১ টি দেশের ৯৬০ জন নাগরিককে বিমান ও জাহাজ যোগে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। ভারতের এই প্রচেষ্টা সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে। নতুন দিল্লি ইয়েমেনে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া ছাড়াও সে দেশের পরিকাঠামো পুনর্গঠনের কাজে ধারাবাহিকভাবে অংশ নিচ্ছে। একটি শান্তিপুর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে ইয়েমেন যাতে আবার আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় গৌরবের সঙ্গে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারে, সমগ্র বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সেটাই একান্ত কাম্য। (মূল রচনাঃ- ডঃ লক্ষ্মী প্রিয়া)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?