দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ভুটান সফর

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং এর আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুদিনের থিম্পু সফর করে এলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল উচ্চ পর্যায়ের এক প্রতিনিধি দল। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর এটি শ্রী মোদির প্রথম ভুটান সফর এবং গত পাঁচ বছরে সেদেশে দ্বিতীয় সফর। পরপর দ্বিতীয়বার কার্যভার গ্রহণ করার পরেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মালদ্বীপ এবং শ্রীলংকা সফর করেন। ভারত তার “প্রতিবেশী প্রথম” নীতির প্রতি যে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে এই তিনটি প্রতিবেশী দেশে সফর সফর তারই পরিচয় বহন করে। জম্মু ও কাশ্মীর প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক রুপ দেওয়ার পাকিস্তানী চেষ্টা নস্যাৎ করতে ভারত যখন আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করে চলেছে সেই সময় এই ভুটান সফর করলেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ভুটান জম্মু ও কাশ্মীরে বিশেষ মর্যাদা বিলোপের প্রশংসা করে একে দৃঢ়, সাহসী এবং সুদূর-প্রসারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে। জম্মু ও কাশ্মীর একান্তভাবেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে তারা জানিয়েছে। 

ভারতের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের নিরিখে ভুটান এই সফরকে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিমান বন্দরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. শেরিং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে স্বাগত জানান। শ্রী মোদি এই সম্পর্ককে ভারতের প্রতিবেশী প্রথম নীতির মূল স্তম্ভ বলে বর্ণনা করেছেন। 

ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনা করেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত-ভুটান অংশীদারিত্ব আরো সম্প্রসারণের বিষয়ে তাঁদের কথা হয়। শ্রী মোদি বিরোধী নেতা ড. পেমা গেমৎসো সহ শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী ভুটানের রয়াল ইউনিভারসিটির ছাত্রছাত্রীদের সামনে ভাষণ দেন। 

সফরে ভারত ও ভুটানের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের বিনিময়ে নতুন গতি সঞ্চারের প্রতিফলন ঘটে। এর আগে, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং ২০২৮র ডিসেম্বরে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে আসেন। ২০১৯এর মে মাসে দিল্লীতে নতুন সরকার গঠিত হবার পরেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শংকর সরকারীভাবে ভুটান সফর করেন।

১৯৬৮সালে ভারত ও ভুটানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হবার পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় এই দেশ সফল প্রতিবেশী হয়ে উঠেছে। ১৯৪৯এ স্বাক্ষরিত ভারত-ভুটান মৈত্রী এবং সহযোগিতা চুক্তি এই সম্পর্কের স্তম্ভ। উন্মুক্ত সীমান্ত, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতার বিশেষ সংস্থান এই চুক্তিতে রয়েছে। উভয় দেশ পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল এবং অর্থনৈতিক বিকাশ, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক শান্তি রক্ষার প্রয়াসে সমান অংশীদারিত্বের কথা তারা স্বীকার করে। 

জল ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মত একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে দুটি দেশের মধ্যে। ভারত, ভুটানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বিনিয়োগকারী। ভারত ঐ দেশে চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করেছে এবং যেখানে ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। 

মহাকাশ গবেষণা, বিদ্যুৎ ক্রয় এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার মত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সংক্রান্ত দশটি সমঝোতা স্মারকপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে এই সফরকালে। এছাড়া উভয় নেতা ম্যাংডেচু হাইডেল প্রজেক্ট, দক্ষিণ এশিয়া উপগ্রহের আর্থ স্টেশন এবং ভুটানে রুপে কার্ড উদ্বোধন করেন। 

প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদি প্রতি মাসে ভারত থেকে এল পি জি সরবহারের পরিমাণ ৭০০ থেকে বাড়িয়ে ১০০০ এম টি করার কথা ঘোষণা করেছেন। শ্রী মোদি ভুটানী প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বাস দেন যে ভুটানে একটি সুপার স্পেশিয়ালিটি হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে ড. শেরিং এর সপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য ভারত সর্বোতভাবে সহায়তা করবে। 

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো সম্প্রসারিত করবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরো মজবুত করবে এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানান দিক নিয়ে আলোচনা করেন। সামনা সামনি বৈঠকে দুই নেতা জলবায়ু পরিবর্তন, পরিকাঠামো, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে কথা বলেন। এছাড়া ভুটানের পঞ্চবার্শিকী পরিকল্পনায় ভারতের কারিগরী এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। (মূল রচনাঃ ড.নিহার আর নায়ক)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?