বাল্টিক দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক

উপরাষ্ট্রপতি এম ভেঙ্কাইয়া নাইডু সম্প্রতি এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া সফর করলেন। বাল্টিক রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে একে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্ব বলা যায়। এই দেশগুলির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি শ্রী নাইডু সেখানে একাধিক বাণিজ্যিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন এবং এই দেশগুলিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের সঙ্গে ভাব বিনিময় করেন। উপরাষ্ট্রপতির এই সফরে কৃষি, সাইবার নিরাপত্তা, ই-প্রশাসন এবং শিক্ষা সংক্রান্ত একাধিক সমঝোতা স্মারকপত্রও স্বাক্ষরিত হয়। শ্রী নাইডু এস্তোনিয়ার হেডস অব মিশন সম্মেলনেও ভাষণ দেন। এই দেশগুলির জনমানসে সংস্কৃত, যোগ এবং আয়ুর্বেদের মতো ভারতের প্রাচীনের ঐতিহ্যের সুগভীর প্রভাবের ওপর আলোকপাত করা হয়। এই দেশগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ট দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগুলি বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে এবং তা ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’এর ভাবনাকেই তুলে ধরে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই তিনটি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই হিন্দী ভাষা সংক্রান্ত বিশেষ পদ রয়েছে।

শুধুমাত্র রাজধানী শহরগুলি ছাড়াও অন্যান্য শহরগুলির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপরাষ্ট্রপতি নাইডু লিথুয়ানিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কৌনাস সফর করেন।

ভৌগলিক দিক থেকে রাশিয়া, নর্ডিক ও সিআইএস রাষ্ট্রগুলির প্রবেশপথ হিসেবে বাল্টিক অঞ্চল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঐ তিনটি বাল্টিক দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য এবং তাদের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়েছে। ইউরোপে আর্থিক মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেও এই অঞ্চলগুলির আর্থিক বিকাশের ধারা অব্যহত রয়েছে। আকারে ক্ষুদ্র হলেও উদ্ভাবন এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের দিক থেকে এই অঞ্চল এগিয়ে রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে একাধিক আন্তর্জাতিক এবং দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে ভারত ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলির অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। বিশ্ব বর্তমানে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতা দ্বন্দ্ব, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি। ২১ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি বিশ্বায়ন এবং জাতীয়তাবাদও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হওয়ার মুখে দাঁড়িয়েও অনেক সময়ই প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন নতুন অংশীদারিত্ব এবং সহযোগিতা।

বিশ্বের দরবারে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং বাল্টিক দেশগুলির ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্যপদ থাকায় উভয়ে আরো জোরদারভাবে একযোগে এই সমস্ত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে সক্ষম।

এর পাশাপাশি এই সমস্ত দেশগুলির ব্যাপক উদ্ভাবণমুলক কাঠামো এবং মেধাভিত্তিক অর্থনীতি ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সক্ষমতা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী বিকাশ এবং মেধার বিকাশের মাধ্যমে ভারতের অর্থনীতির আধুনিকীকরণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রয়াসে এই দেশগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণের যথেষ্ট সম্ভবনা রয়েছে। ভারতের মেক ইন ইন্ডিয়া, ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং স্টার্ট আপ ইন্ডিয়ার মতো উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিতে বাল্টিক সংস্থাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ভারতের সঙ্গে এই দেশগুলির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ভারত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা পাচ্ছে। অন্যদিকে বাল্টিক দেশগুলি এই বিশ্ব মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের সুবিশাল বাজারে প্রবেশের সুবিধা গ্রহণ করছে। উল্লেখ্য, এই দেশগুলিতে ভারতের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস না থাকা সত্বেও ২০১৮-১৯এ এই দেশগুলির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ভারত ও বাল্টিক দেশগুলির মধ্যে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির প্রভূত সম্ভবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে পর্যটন, শিক্ষা, উৎপাদন, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও ওষুধ ক্ষেত্র এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব আরো প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ হল এই গতি ও পরিবর্তনের ধারাটি অব্যহত রাখা।

( মূল রচনাঃ রাজর্ষি রায়)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?