ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ক আরও মজবুত

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই সপ্তাহের ফ্রান্স সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে এবং একই সঙ্গে ১৯৯৮ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত অংশীদারিত্বকেও মজবুত করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনার বিষয়ে নতুন দিল্লী ফ্রান্সের কাছ থেকে কোনো সমালোচনা তো পায় নি বরং ফ্রান্স জানিয়েছে এই বিষয়টি ভারতের এক অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং ফ্রান্স রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার আলোচনায় এই বিষয়টিতে ভারতকে সমর্থন করেছিল। 

প্রধানমন্ত্রী জানান যে ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ক ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’-এর মজবুত ভিত্তির ওপর ও বহু দশকের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। উভয় পক্ষই এই কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও মজবুত করে এক রূপরেখা তৈরি করেছে যার কিছু ক্ষেত্র হল- দক্ষতা উন্নয়ন, অসামরিক বিমান পরিবহণ, তথ্য প্রযুক্তি ও মহাকাশ। শ্রী মোদী এই দুই দেশের মধ্যে মজবুত সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ওপর জোর দেন এবং এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম দফায় রাফায়েল যুদ্ধ বিমান সরবরাহ করার বিষয়টিকেও স্বাগত জানান। দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্বের কথা উল্লেখ করে উভয় নেতাই সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদের মত আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার আহ্বান জানান এবং নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতাকে আরও বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হন। ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স বা FATF-এ ভারত-ফ্রান্স সহযোগিতা সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তা বন্ধ করার যে দাবি জানিয়ে আসছিল তা সফল হয়েছে এবং এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তানকে FATF কালো তালিকাভুক্তও করেছে। রাষ্ট্র সঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তা বন্ধ করার বিষয়ে ২০১৯-এর মার্চ মাসে গৃহীত প্রস্তাব ২৪৬২কে রূপায়ন করার আহ্বান জানিয়েছে দুই দেশই। এই প্রসঙ্গে ২০১৯ –এর নভেম্বর মাসে মেলবোর্নে আয়োজিত হতে চলা সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তা বন্ধ করা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে উভয় নেতাই স্বাগত জানিয়েছেন।

নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগিতা ক্ষেত্রে দুই দেশ নৌ-বাহিনী ও বিমান বাহিনীর মধ্যে যথাক্রমে বরুণ ও গরুড় সামরিক মহড়া চালায়। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে ভারত ও ফ্রান্স, সমুদ্র পথে চলাচলের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা ও সামুদ্রিক এবং সাইবার সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সাইবার সুরক্ষা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির জন্য এক নতুন রূপরেখা তৈরিতে সম্মত হয়েছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কৃত্রিম মেধা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ‘Exascale’ সুপার কম্পিউটিং (Exascale হল এক অত্যাধুনিক সুপার কম্পিউটিং ব্যবস্থাপনা যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ লক্ষের পঞ্চঘাত হিসাব করে ফেলতে পারে) ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো সহ সংশ্লিষ্ট স্টার্ট আপদের এই ব্যবস্থায় আরও কাছাকাছি আনার লক্ষ্যে সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অফ অ্যাডভান্স কম্পিউটিং ও অ্যাটোসের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিদ্যুৎক্ষেত্র। মহারাষ্ট্রের জইতাপুরে ৬টি পরমাণবিক চুল্লী নির্মানের জন্য দুই দেশই ভারতের NPCIL এবং ফ্রান্সের EDF-এর মধ্যে পরমাণু শক্তির বিষয়ে যে আলোচনা চলছে তার অগ্রগতি পরীক্ষা করে দেখে। উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সৌর জোট গঠনে যৌথ প্রয়াসের ফলে ভারতের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ফ্রান্সের ভূমিকা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল মাকরঁ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় সহ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক ও অর্থ বিষয়ক আলোচনা আবার শুরু করার জন্য সম্মত হয়েছেন। নাগরিক সমাজ পর্যায়ে ভারত ২০২১-২২ সালে আরও একবার ‘নমস্তে ফ্রান্স’ আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুই দেশের মধ্যে পড়ুয়া বিনিময় বাড়ানোর ওপর জোর দেন এবং তিনি ভারতে ফরাসি পড়ুয়াদের সংখ্যা বৃদ্ধিকে স্বাগত জানান। উল্লেখ্য, ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে চলতি অংশীদারিত্বে ফ্রান্সে ভারতীয় পড়ুয়াদের অধ্যয়ন সমাপ্ত হওয়ার পরেও তাদের সেখানে কয়েক বছর থাকার ও কাজ করার সংস্থান রয়েছে। মহাকাশ গবেষণা ক্ষেত্রে ফ্রান্স, ২০২২ সালের ভারতের মানুষ নিয়ে মহাকাশ অভিযানে মনোনীত ভারতীয় নভোশ্চরদের জন্য মেডিক্যাল সহায়তা কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবে। শ্রী মোদী প্যারিসে ভারতীয় সম্প্রদায়ের সামনে ভাষণ দেন এবং গত শতকের পাঁচ ও ছয়ের দশকে ফ্রান্সে এয়ার ইন্ডিয়ার এক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত ভারতীয়দের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে স্মৃতিসৌধেরও উদ্বোধন করেন।

আঞ্চলিক বিষয়ে উভয় দেশই ইরানের পরমাণু কর্মসূচীতে যৌথ সর্বাত্মক কর্ম পরিকল্পনার সম্পূর্ণ রূপায়নের ওপর জোর দেয় এবং এই বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের কথা জানায়। G7 শীর্ষ সম্মেলনে ভারত সদস্য না হলেও রাষ্ট্রপতি মাকরঁ ভারতকে এই সম্মেলনে অংশ নিতে এক আমন্ত্রিত অংশীদার হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদী, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ডিজিটাল রূপান্তরণ নিয়ে ভাষণ দেবেন। এই G7 সম্মেলন, প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদীকে অন্য G7 নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সুযোগ দিচ্ছে। ভারতের সঙ্গে ফ্রান্সের সর্বাত্মক, গতিশীল ও বহুমুখী সম্পর্ক রয়েছে এবং শ্রী মোদীর এই ফ্রান্স সফর সদর্থেই এক ফলপ্রসূ সফর হতে চলেছে । 


[মূল রচনা- অধ্যাপক উম্মু সালমা বাওয়া]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?