ভারতের সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়া

সংবিধানের ৩৭০ ধারার প্রত্যাহারের ঘটনায় পাকিস্তান হতচকিত। ভারতের এ ধরণের পদক্ষেপ পাকিস্তানের ধারণার অতীত ছিল। সংবিধানের ৩৭০ ধারার প্রত্যাহার এবং জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখকে নিয়ে দুটি নতুন কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে ইসলামাবাদের কাছে এই পদক্ষেপ এক বড় চমক। পাকিস্তান এও জানে যে এর ফলে কাশ্মীর সংক্রান্ত সামগ্রিক পরস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। যার ফলে ইমরান খান সরকারের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ছে। 

নতুন দিল্লি থেকে পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া, পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে দেশে ফেরার নির্দেশ এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপনের হুমকি দিয়ে চলেছে ইসলামাবাদ। যদিও পাকিস্তানের এ ধরণের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে কোনো গুরুত্ব পায় নি। 

কাশ্মীর প্রসঙ্গ সবসময়েই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি বড় ভূমিকা নিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং কাশ্মীর প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রস্তাব এ বিষয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তবে ভারতের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে কাশ্মীর প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দৃষ্টিকোণেও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। 

পাকিস্তান কাশ্মীর প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করেছে। পাকিস্তানের অসামরিক সরকার এবং সেনাবাহিনী উভয়েই ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে। তবে বিরোধীরা অনেকেই ইমরান খানের মার্কিন সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ধারণা কাশ্মীরিদের স্বাধীনতালাভের প্রয়াসকে খর্ব করাই এই সফরের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল। দেশের অর্ধেকেরও বেশী সাংসদ বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দী থাকায় সংসদের যৌথ অধিবেশন আহ্বানের যৌক্তিকতা নিয়েও বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন। এদিকে ইমরান খান সরকার কাশ্মীর প্রসঙ্গে বিরোধীদের অহেতুক রাজনীতি না করার পরামর্শ দিয়েছে। 

কাশ্মীরে জনসংখ্যার বিন্যাসে যেকোনো ধরণের পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়বে বলেও সেদেশের প্রচার মাধ্যম এবং সোস্যাল মিডিয়ায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আরো স্পষ্টভাবে বলা যায়, একাধারে জেহাদের নামে বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠন থেকে অর্থ সংগ্রহ, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় পশ্চিমী দেশগুলির কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তালাভের জন্য কাশ্মীর প্রসঙ্গ পাকিস্তানের অন্যতম হাতিয়ার। ভারতের, কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত, আর্থিক যোগানের হাতিয়ার হিসেবে কাশ্মীরকে ব্যবহারের সমস্ত পথ পাকিস্তান ও তার ধর্মীয় সংগঠনগুলির কাছে বন্ধ হয়ে গেল। 

পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, কাশ্মীরকে প্রশাসনিক স্তরে ভারতের মধ্যে নিয়ে আসার ফলে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হবে। অনেকের মতে গত এক দশকে কাশ্মীরিদের সংগ্রামে সমর্থনের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে। পাকিস্তান সরকার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরতে পারে নি বলেও তাঁরা অভিযোগ করেছেন। এরপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও পাকিস্তানের পক্ষ নিতে আগ্রহী হবে না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এ বিষয়ে ইসলামিক সহযোগিতা সংগঠনভূক্ত দেশগুলির দ্বারস্থ হয়েছেন। তিনি তুরস্ক এবং মালয়েশিয়ার নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও যোগাযোগের প্রয়াস চালাচ্ছেন। 

ভারতের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে কারণ এই পদক্ষেপের ফলে কাশ্মীর এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা এখন আর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে থাকল না, যা রাজনৈতিক অথবা কৌশলগত উভয় দিক থেকেই পাকিস্তানের জন্য বিরাট ক্ষতি। 

পাকিস্তানের স্মরণ করা উচিত, অধিকৃত কাশ্মীর এবং গিলগিট-বলটিস্তানে তারা কি করেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে গিলগিট-বলটিস্তানকে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর থেকে পৃথক করা হয় এবং এখনও পর্যন্ত এই অঞ্চল সব ধরণের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই অঞ্চলের দৈনন্দিন কার্যকলাপও নিয়ন্ত্রিত হয় ইসলামাবাদ থেকে। সুতরাং পাকিস্তান আজ যখন কাশ্মীর ও লাদাখের মানুষজনের অধিকারের কথা বলছে তখন তারা গিলগিট-বলটিস্তান এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষজনের অধিকারের কথাও ভাববে কি? এখন সেটাই বড় প্রশ্ন। 

( মূল রচনাঃ ডঃ জয়নাব আখতার )

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?