জাপান-উত্তর কোরিয়া বাণিজ্য উত্তেজনা

পূর্ব এশিয়ার দুটি অর্থনীতি জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া বাণিজ্য বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাপান বাণিজ্য বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। হাইড্রোজেন ফ্লুওরাইড গ্যাস, ফ্লুওরিনেটেড পলিমাইড, এবং উচ্চ প্রযুক্তির শিল্পে ব্যবহৃত ফটো রেসিস্টস সহ তিনটি ক্যামিক্যালসের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে এই ব্যবস্থা। 

জাপান এই সব ক্যামিক্যালসের এন্ড ইউজের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সামরিক ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা রুপায়নের বিষয়ে টোকিও চিন্তা ব্যক্ত করেছে। এছাড়া, বিশ্বস্ত বাণিজ্যিক অংশীদারদের অগ্রাধিকারমূলক শ্বেত তালিকা থেকে জাপান দক্ষিণ কোরিয়াকে বাদ দিয়েছে। এর ফলে ১১০০টি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর কঠোর রপ্তানি নিরীক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদি বাণিজ্য ব্যবস্থায় বিধিনিষেধ বৃদ্ধি পেতে থাকে তবে বিশ্ব যোগানের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। 


প্রথম সাড়ির দক্ষিণ কোরিয় কোম্পানীগুলি রাসায়নিক পদার্থের সরবরাহের জন্য জাপানের ওপর নির্ভর করে। চিপ্স এবং উন্নত স্ক্রীনের জন্য এগুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান বিধিনিষেধের আওতায় জাপানী রপ্তানিকারকদের দক্ষিণ কোরিয়ায় সামগ্রি পাঠানোর আগে তাদের অনুমতির প্রয়োজন। এর জন্য প্রায় ৯০ দিনের দরকার। দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানীগুলি উৎপাদন চালিয়ে যাবার জন্য মজুত রসায়নের ওপর নির্ভর করছে। তবে, যদি বর্তমান বাণিজ্য উত্তেজনা অব্যাহত থাকে তবে স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিন সামগ্রির উৎপাদনের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া তাদের শ্বেত তালিকায় জাপানকে নীচের দিকে রেখেছে। যে সমস্ত দেশ আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিচালিত করে না টোকিওকে নতুন নির্ধারিত সেই বাণিজ্য শ্রেণীতে রাখা হবে। এছাড়া, সোল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সাধারণ পরিষদের কাছে তাদের বিষয়টি উত্থাপনের চেষ্টা করে, তারা আশা করছে এর ফলে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে। 

যদি বাণিজ্য উত্তেজনা চলতে থাকে এবং জাপানের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কৌশলগত দ্রব্য সরবরাহেরর ওপর প্রভাব অব্যাহত থাকে তবে মধ্যবর্তি পণ্যের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে এবং এন্ড ইউজ শিল্প প্রভাবিত হবে। দক্ষিণ কোরিয়া তাদের অর্থনৈতিক বিকাশের আনুমানিক হার আগের ২.৬-২.৭ এর তুলনায় হ্রাস করে ২.৪-২.৫ এ নামিয়ে এনেছে। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার স্থানীয় শিল্পে ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংযোজনের পরিকল্পনা করছে। এতে জাপানী রপ্তানী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা হবে বলে তাদের ধারণা। বিভিন্ন কোম্পানী সরবরাহ শৃংখলাকে বজায় রাখতে চীনে তাদের সরবরাহকারীদের সম্প্রসারিত করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার যুক্তি হল জাপান তাদের অর্থনীতিকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখছে এর কারণ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বৃহত্তর ঐতিহাসক বিষয়গুলির সমাধানে তাদের অক্ষমতা। নিষেধাজ্ঞামূলক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাসমূহ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এর আগে, ২০১৮তে দক্ষিণ কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্ট ঔপনিবেশিক সময়ে বাধ্যতামূলক শ্রমের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে জাপানের মিৎসুবিসি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজকে আদেশ দেয়, এর পর তাদের সম্পত্তি আটক হয়। এছাড়াও, নিপ্পন স্টিল কর্পোরেশন এবং নাচি ফুজিকোশি কর্পোরেশন সহ অন্য দুটি কোম্পানীর সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হয়। এদিকে জাপানী সরকার জানায় যে ১৯৬৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী এই ধরণের সমস্ত দাবী দাওয়ার নিস্পত্তি হয়েছে। এই চুক্তিতে দুটি দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাওয়া হয়। 

চলতি বাণিজ্য বিবাদ পূর্ব এশিয়ার এই দুটি চিরাচরিত মার্কিন সহযোগীর মধ্যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়কেও প্রভাবিত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া জাপানের সঙ্গে সামরিক তথ্য সংক্রান্ত সাধারণ নিরাপত্তা চুক্তি বাতিল করে, কারণ সোল মনে করে টোকিওর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নেওয়া অসুবিধা সাপেক্ষ। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল দুটি দেশের মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং উত্তর কোরিয়ার পরমাণু হুমকির বিরুদ্ধে উন্নত সহযোগিতা বিনিময়। এই চুক্তির আগে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করতো। 

এই দুটি দেশকে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বকেয়া প্রশ্নগুলির মিমাংসায় রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দিতে হবে এবং বর্তমান বিশ্বাস-ঘাটতির সুরাহা কল্পে কাজ করতে হবে। বৃহত্তর মার্কিন-চীন বাণিজ্য সংঘাত যখন আন্তর্জাতিক রপ্তানী বাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে সেই সময় জপান-দক্ষিণ কোরিয়া বাণিজ্য উত্তেজনা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।


জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া উভয়েই ভারতের কৌশলগত অংশীদার এবং ভারতের পূবে কাজ করার নীতির ক্ষেত্রে এই দেশ দুটির গুরুত্ব অপরিসীম। মুক্ত বাণিজ্য এবং উন্মুক্ত বাজারের লক্ষ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমণ অপরিহার্য। (মূল রচনাঃ তিতলি বসু)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?