সপ্তম আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৈঠক

আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৈঠক সম্প্রতি হয়ে গেল ব্যাঙ্ককে। মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের আবহে এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সংঘাতের মধ্যেই এই বৈঠক সংগঠিত হল। ভারত এর আগে গত সপ্তাহের আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৈঠকে অংশ নেয় নি। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক কাজকর্মে ভারতের গতিশীলতাকে চাঙ্গা করতেই এই বৈঠকটি ছিল। এই গোষ্ঠীর অন্য সদস্য দেশগুলির সঙ্গে দেশের বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শ্রী গোয়েল মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেন। 

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির অ্যাসোসিয়েশনের ১০টি সদস্য দেশ ও ছয়টি অন্য আঞ্চলিক দেশ যেমন ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এই আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব মঞ্চে সদস্য দেশ। উল্লেখ্য, সমগ্র আসিয়ান ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে অবাধ বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করতে এই সংগঠনটি গঠন করা হয়েছিল। সপ্তম মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকের পরে অংশগ্রহণকারী ১৬টি সদস্য দেশের যৌথ বিবৃতিতে এই সমগ্র অঞ্চলে একটি অবাধ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কর্মসূচীর ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।, আয়োজক দেশ থাইল্যান্ডের উপ-প্রধানমন্ত্রী তথা বাণিজ্য মন্ত্রী শ্রী জুরিন লাকসানাউইসিত জানান যে, অবাধ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত চূড়ান্ত চুক্তি সম্ভবত আগামী বছরে সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। 

এটি মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে বিশ্বে ইউরোপীয় সঙ্ঘের পরে আসিয়ানই হলো দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক জোট। আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্পর্কিত দক্ষিণ এশীয় অ্যাসোসিয়েশন বা সার্কের অর্থনৈতিক বিষয়ে খুব বেশি অগ্রগতি না হওয়ায়; ভারত আসিয়ান দেশগুলির সঙ্গে তার সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়াতে শুরু করে।। আজ, আসিয়ান সদস্যভুক্ত দেশগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। আসিয়ান দেশগুলির সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ২হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ সালে হয় ৯ হাজার ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৮-১৯ সালে আসিয়ান দেশগুলি ভারতের শীর্ষ স্থানীয় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই পরিমাণ ভারতের মোট বাণিজ্যের ১১.৪৭শতাংশ। ২০১৮ সালে ভারত ছিল আসিয়ান ব্লকের ষষ্ঠ বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। 

এই পরিস্থিতিতে, অবাধ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়িত হলে ভারত বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন পণ্য, পরিষেবা, বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ত ও সরকারি আহরণ ক্ষেত্রে ব্যাপক সুযোগ পাবে। এটা বোঝা প্রয়োজন যে আসিয়ান দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক আদতে ভারতের ‘পূব-মুখী নীতি’র মূল বিষয়। এছাড়াও আসিয়ান হলো বিস্তৃত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের প্রবেশদ্বার। ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে সহযোগিতা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত ও আসিয়ান দেশগুলির দৃষ্টিভঙ্গীও প্রায় একই। এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুবই মজবুত। কিন্তু মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিও মোকাবিলা করতে হবে ভারতকে। 

২০১৮র এপ্রিল থেকে ২০১৯-এর মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কালে আসিয়ান দেশগুলি থেকে ভারতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৪২কোটি ডলার যা আদতে ভারতে মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রায় ৩৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে আসিয়ান দেশগুলিতে ভারতের বিনিয়োগ ছিল ১হাজার৭০০ কোটি ডলার যা ভারতকে আসিয়ানের ষষ্ঠ বৃহত্তম প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের উৎসস্থল করে তুলেছিল। 

ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৈঠকের পাশাপাশি জাপান, সিঙ্গাপুর, চীন, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপিন্স ও থাইল্যান্ডের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেন। 

ভারত-আসিয়ান অবাধ বাণিজ্য চুক্তি ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে রূপায়িত হয়। সেই সময় বাণিজ্য মূলত কেন্দ্রীভুত ছিল কয়েকটি পণ্যের ওপর যেমন পাম তেল, রবার, কফি, কালো চা ও গোলমরিচের ওপর। ভারতে এক আশঙ্কার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল এই ভেবে যে এই অবাধ বাণিজ্য চুক্তির ফলে আসিয়ান দেশগুলি থেকে এই সমস্ত পণ্যের আমদানি অত্যধিক বৃদ্ধি পাবে যা আসলে এই সব ক্ষেত্রে ভারতীয় শিল্পের ক্ষতিসাধন করবে। ফলস্বরূপ এই সব পণ্যগুলির ওপর অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত শুল্ক হ্রাস করে বিশেষ পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, বা এগুলিকে বর্জিত পণ্যের তালিকায় স্থান করে দেওয়া হয়েছিল এবং এইভাবেই এগুলিকে এই চুক্তির আওতার একেবারে বাইরে রাখা হয়েছিল। এই অবাধ বাণিজ্য চুক্তির আর্থিক যৌক্তিকতার এখন পর্যালোচনা চলছে। 

আসিয়ান দেশগুলির সঙ্গে ভারতের অবাধ বাণিজ্য চুক্তির পর্যালোচনার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত, আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আলোচনার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং এই চুক্তি এই বছরের শেষের মধ্যেই চূড়ান্ত রূপ নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হতে পারে পরের বছরের প্রথম দিকে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত এক উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে এবং নতুন দিল্লী বাণিজ্য ও বিনিয়োগে এক স্থিতিশীল বৃদ্ধির ধারণা তুলে ধরবে।

[মূল রচনা- মনোহর মনোজ]
___________

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?