আফগানিস্তানের ওপর ট্রাম্প-তালিবান আলোচনা বাতিলের প্রভাব
তালিবানরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনার উদ্দেশ্যে এ বছরের প্রথম দিকে ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গঠন করেছিল। সেই অনুযায়ী, আফগান সরকার ও তালিবানদের মধ্যে সংঘর্ষ চলা সত্বেও এই আলোচনায় অগ্রগতি প্রত্যাশা করা গিয়েছিল। তবে আফগানিস্তানে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার কারণে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শুরু থেকেই একটা প্রশ্ন চিহ্ন থেকেই গিয়েছিল।
ওয়াশিংটন-তালিবান আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তানে এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা যার মধ্যে তালিবানদের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের পর্যাপ্ত সংস্থান থাকবে। এ ছাড়াও শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় তালিবানদের কূটনৈতিক স্তরে পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তবে এরই পাশাপাশি আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদ অবসানে তালিবান নেতাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বাস দিতে হবে বলে ওয়াশিংটন শর্ত রাখে। অপরদিকে তালিবানরাও আফগান ভূখণ্ড থেকে মার্কিন বাহিনীর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সহ সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। শান্তি আলোচনার এই পর্যায়ে কাবুলে একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বোমা হামলা ও এই ঘটনায় একজন মার্কিন সেনা সহ ১২ জনের প্রাণহানি সমগ্র শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়ায় মাঝপথেই ছেদ টানল। তালিবানরা এই আক্রমণের দায় স্বীকার করল। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা করে শান্তি আলোচনা বাতিল ঘোষণা করলেন। প্রায় দু দশক পর তালিবানদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে যে প্রত্যাশা জেগেছিল, তা আবার অপূর্ণই রয়ে গেল।
এদিকে তালিবানরা এখনও এই আলোচনায় রাজী বলে জানালেও কূটনৈতিক মহলের ধারণা, পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে তালিবানদের পিছনে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে;, কারণ, আফগান ভূখণ্ড থেকে মার্কিন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক প্রত্যাহার করা হলে পাকিস্তানে সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর জন্য তা আফগানিস্তান সহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের তৎপরতা চালানোর পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করবে।
সর্বশেষ পাওয়া খবরে অবশ্য জানা গেছে, আফগানিস্তানের হিংসাত্মক পরিস্থিতি অবসানের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানসূত্র খুঁজে দেখার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে নরওয়ে, জার্মানি ও কাতার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তালিবানদের মধ্যে যোগাযোগ পুনর্স্থাপনের প্রয়াস চালাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেই আফগানিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, যে নির্বাচন এ মাসের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হবার কথা।
তবে তালিবানরা এই নির্বাচনকে অবৈধ বলে ইতিমধ্যে ঘোষণা করায় এই নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক হিংসার আশংকা থেকে গেছে। এই আশংকার প্রেক্ষিতে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ আবার অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কারণ, শান্তি আলোচনা অবিলম্বে আবার শুরু না হলে আফগান সরকার ও মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে তালিবানদের সংঘর্ষ চলতেই থাকবে।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর কিছু দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। সে দিকটি বিবেচনা করলে, আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের দেশে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তাঁর কাছে এই বাতিল হওয়া শান্তি বৈঠক আবার শুরু করতে উদ্যোগী হওয়া ছাড়া বিশেষ কোনও বিকল্প নেই বলেই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত। অনেকে বলছেন, আফগানিস্তানের আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হলেই তালিবান-মার্কিন শান্তি আলোচনার আবার সম্ভাবনা আছে। তবে শান্তি আলোচনার পূর্ব শর্ত হিসেবে ওয়াশিংটন, তালিবানদের কাছ থেকে সন্ত্রাস দমন বিষয়ক যে গ্যারান্টি চেয়েছে, তালিবান প্রতিনিধি দল কতদূর এতে সম্মত হবে সে বিষয়ে এক বড় প্রশ্ন চিহ্ন রয়েই গেছে। কাজেই ‘হার্ট অফ এশিয়া’ নামে পরিচিত আফগানিস্তানের পরিস্থিতিতে এই মুহূর্তে এক ধরণের অচল অবস্থা বিরাজ করছে।
এদিকে সম্প্রতি কিছু দিন তালিবানরা চীন, রাশিয়া ও ইরান ছাড়াও সৌদি আরব ও কাতারের মত কিছু উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে আলোচনা করলেও ভারতের সঙ্গে এই ধরণের কোনও উদ্যোগ নেয় নি। তবে গতমাসে তালিবান সূত্র থেকে ভারতের সঙ্গেও কথা বলার আগ্রহ ব্যক্ত করা হয়। তা সত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বাতিল হওয়ায় ভারতের সঙ্গে প্রস্তাবিত আলোচনা আদৌ সম্ভব হবে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। তাছাড়া, নতুন দিল্লি বরাবরই বলে আসছে, কোনও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সে কখনই কোনো আলোচনায় বসবে না। (মূল রচনাঃ-কল্লোল ভট্টাচার্য)
Comments
Post a Comment