ভারত-ইরাণ সহযোগিতার নতুন নীতিকৌশল অনুসন্ধান

প্রতিকূল আঞ্চলিক দৃশ্যপটে এই সপ্তাহে তেহেরানে ভারত ও ইরাণের মধ্যে ষষ্ঠ পর্যায়ের বিদেশ কার্যালয় পরামর্শ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের বিদেশ সচিব বিজয় গোখলে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব করেন এবং ইরেণের প্রতিনিধিত্ব করেন সেদেশের উপ বিদেশ মন্ত্রী ড. সাঈদ আব্বাস আরাগচি। শ্রী গোখলে ইরাণের বৈদেশিক বিষয়ক মন্ত্রী ড.জাভেদ জারিফ এবং ইরাণের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খমেইনির বরিষ্ঠ উপদেষ্টা ড. আলি আকবর বিলায়েতীর সঙ্গেও কথা বলেন। 

উভয় পক্ষ শাহিদ বেহেস্তি বন্দর, চাবাহার এবং ভারত, ইরাণ ও আফগানিস্তানের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক পরিবহন চুক্তি রুপায়ণের মত চলতি যোগাযোগ এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলি সহ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে। এছাড়া, বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয় নিয়েও কথাবার্তা হয়। উভয় পক্ষ পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং দুটি দেশের মধ্যে বিনিময়ের বর্তমান গতি বজায় রাখার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। স্থির হয় যে পরবর্তি দফার বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে খুব শীঘ্রই ইরাণে। 

ওয়াশিংটন ছ’মাসের বেশি মুকুবের মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকার করায় ২০১৯এর মে মাসে ভারত, ইরাণ থেকে তেল আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়- এই প্রেক্ষিতে বিদেশ কার্যালয় পরামর্শকে বিশ্লেষন করতে হবে। ভারতে নিযুক্ত ইরাণী রাষ্ট্রদূত আলি চেগেনি উল্লেখ করেন যে তুরস্ক, রাশিয়া এবং চীন ইরাণের সঙ্গে জ্বালানী সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে অথচ ভারত অন্যভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মনে রাখতে হবে ভারত ইরাণ থেকে সাময়িকভাবে তেল আমদানি বন্ধ রেখেছে। সাম্প্রতিক ভারত-রুশ শিখর বৈঠকে নতুন দিল্লী এবং মস্কো উভয়েই ইরাণের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে। ২০১৯এর মার্চে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উত্তর দক্ষিণ ট্রাঞ্জিট করিডোর’INSTAC সমন্বয় পরিষদের সপ্তম বৈঠকে ভারত এই সহযোগিতা এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়।

এবছর মে মাস থেকে ইরাণ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ইরাণ এবং ভারত আবার একাধিক চ্যালেঞ্জের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যান্য উপায়ে কিভাবে ইরাণের সঙ্গে জ্বালানী সম্পর্ক পুনর্বহাল করা যায় ভারত তার পথ খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ইরাণ ছিল ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম অশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু ২০১৩-১৪ নাগাদ এই স্থান নেমে হয় সাত। এবছর মে মাসে ইরাণ থেকে তেল আমদানী বন্ধ করার সময়ও ভারত ছিল চীনের পরেই ইরাণের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। স্থিতিশীল জ্বালানী সরবরাহকারী দেশ হিসেবে ইরাণের গুরুত্ব অবজ্ঞা করা যায় না।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরেশিয়ায় প্রবেশদ্বার, পশ্চিম এশিয়া এবং আফগানিস্তানে তাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং প্রভাবের ফলে ইরাণের সঙ্গে নতুন দিল্লীর সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। ইরাণের সংযোগ প্রকল্প INSTC এবং চাবাহার, আফগানিস্তানে তাদের সমর্থন এবং চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশসমুহ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক ও সমর্থনের জন্য ইরাণকে ভারতের প্রয়োজন। ইরাণ-চীন-রাশিয়া; ইরাণ-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-চীন এবং রাশিয়ার মত শক্তিগুলির সামঞ্জস্যের কারণে ভৌগলিক রাজনৈতিক ভাবে ইরাণের সঙ্গে ভারতের অব্যাহত সম্পর্ক একান্ত আবশ্যক। 

২০১৬ সালের মে মাসে ইরাণ সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায় শুরু করেন। দুদেশের নেতৃত্ব তখন বাণিজ্য, অর্থনীতি, শক্তি সহযোগিতা এবং পরিকাঠমাও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রতি আলোকপাত করেন। ২০১৮র ফেব্রুয়ারীতে রাষ্ট্রপতি হাসান রৌহানির তিন দিনের ভারত সফর এবং এবছর জানুয়ারীতে বিদেশ মন্ত্রী মহম্মদ জাভেদ জারিফের ভারত সফরের সময় এই সম্পর্ক আরো এগিয়ে যায়। 

বর্তমানের কূটনৈতিক তৎপরতা বিদেশ সচিবের নেতৃত্বাধীন পরামর্শ বৈঠকে প্রতিফলিত। এর পর আশানুরুপভাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তেহেরান সফর থেকে এটি আরো পরিস্কার হয়ে গেছে যে ইরাণকে আলাদা করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ সত্বেও মোদি সরকার ইরাণের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন নতুন নীতিকৌশল সন্ধানে কতটা আগ্রহী। শত্রুতা দূরে সরিয়ে রেখে আঞ্চলিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হলে তা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য ফলপ্রসু হবে না- এতে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সম্প্রদায়গুলিও উপকৃত হবে। (মূল রচনাঃ ড. মীনা সিং রায়)


Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?