আরামকো আক্রমণের ফলে মার্কিন-ইরাণ উত্তেজনা বৃদ্ধি

দাম্মামের কাছে সৌদি তেল কম্পানী আরমকোর পরিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম অশোধিত তেলের কারখানা আবকায়াক এবং খুরাইসের ওপর সাম্প্রতিক দ্রোণ হামলার ফলে উপসাগরে বর্তমান মার্কিন-ইরাণ উত্তজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রেক্ষিতে ১৯৯১এ উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইয়েমেন ভিত্তিক আনসার আল্লাহ (হাউতি) এই আক্রমণের দায়িত্ব দাবী করেছে। আক্রমণে কেউ আহত না হলেও সৌদি আরবকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে হাউতি আক্রমণ ভবিষ্যতে আরো ব্যাপক হবে। সৌদি তেল কোম্পানীর বিরুদ্ধে এটাই প্রথম আক্রমণ নয়। গতমাসে সৌদি আরবের আরেকটি তৈল ক্ষেত্র শায়াবাহতেও হাউতিরা দ্রোণের সাহায্যে আক্রমণ করে। 

সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমান এই ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ বলে অভিহিত করেছেন এবং জানিয়েছে সৌদি আরব এই আগ্রাসনের মোকাবিলায় সক্ষম। এই আক্রমণের ফলে রিয়াদ তাদের তেলের পাইপ লাইন বন্ধ করে দিয়েছে। এই লাইনে প্রতিদিন ০.২ মিলিয়ন ব্যারেল আরবের অশোধিত তেল সৌদি আরামকো থেকে বাহারিন পেট্রোলিয়াম কোম্পানীতে যায়। এছাড়া, মধ্য প্রাচ্যের জলপথ নিরাপদ রাখতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে অস্ট্রেলিয়া, বাহারিন এবং ব্রিটেনের সঙ্গে সৌদি আরবের যোগ দেবার কথা। সৌদি মন্ত্রী সভা বলেছে এই আক্রমণ জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা বিঘ্নিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিকাশ প্রভাবিত করেছে। ইরান এই দ্রোণ আক্রমণের তদন্তের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘঠন সহ রাষ্ট্রসংঘকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে এই আক্রমণের নিন্দা হয়েছে। তবে সবচেয়ে কঠোর সমালচনা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই অঞ্চলে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের জোট খুব মজবুত। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প ইরাণের প্রতি দোষারোপ করেছেন এবং পালটা সামরিক আক্রমণের হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটন সৌদি আরবের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান বৃদ্ধি করেছে। 

মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী মাইক পম্পিও সৌদি আরব এবং ইউ এ ই সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি এই আক্রমণ এবং এই অঞ্চলে ইরানী আগ্রাসনের পালটা ব্যবস্থার বিষয়ে কথাবার্তা বলবেন। ইরাণ এই অভিযোগ তীব্রভাবে অস্বীকার করেছে এবং তারাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। তারা দাবী করেছে যে ২০১৫র এপ্রিলের ইরাণ পরমাণু চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিলে এই বিপর্যয় এড়ানো যেতে পারে। ইরাণী রাষ্ট্রপতি হুসেন রৌহানি বলেন যে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে রিয়াদকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য সৌদি আরবের তৈল ক্ষেত্রের ওপর হাউতিদের এই আক্রমণ। ইরাণের বিদেশ মন্ত্রী জাভেদ জারিফ উল্লেখ করেন যে আমেরিকা তাদের সর্বাধিক চাপ সৃষ্টির নীতিকে সর্বাধিক প্রতারণার ণীতিতে পরিবর্তিত করছে। এইসব আক্রমণের ফলে বিশ্বের জ্বালানী নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। 

আক্রমণের প্রভাবে সৌদি আরবের তেলের উৎপাদন প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্বে তেলের সরবরাহ পাঁচ শতাংশের বেশি বন্ধ হয়ে গেছে এবং তেলের মূল্য বেড়েছে ১৫ শতাংশ। তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার ভীতি কাটাতে সৌদি আরব তার এশীয় ক্রেতাদের আশ্বাস দিচ্ছে যে তারা অক্টোবরের চাহিদা পূরণ করবে। রিয়াদ ভারতকে আশ্বাস দিয়েছে যে উৎপাদন কম হওয়া সত্বেও তারা সরবরাহ চুক্তির মর্যাদা দেবে। 

সৌদি আরব ভারতের অশোধিত তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক; তবে সাম্প্রতিক আক্রমণের ফলে ভারতকে অন্য বিকল্প দেখতে হবে। সেই বিকল্পে রাশিয়া বা ইরাণ থাকতে পারে। ভারত খুবই উদ্বিগ্ন। একদিকে ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলে মার্কিন-ইরাণ উত্তেজনা এবং অন্যদিকে তেলের ক্রমবর্ধমান মুল্য আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর তীব্র প্রতিকূল প্রভাব পড়তে চলেছে। 


ভারতের বহু মানুষ উপসাগরীয় দেশগুলিতে বসবাস করে, নতুন দিল্লীর কাছে তাদের নিরাপত্তাও চিন্তার বিষয়। তাই সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে এই সংকট যাতে তীব্রতর হয়ে না ওঠে সে বিষয়ে যত্নবান হতে হবে। (মূল রচনাঃ ড. লক্ষ্মী প্রিয়া)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?