মোঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রপতির ভারত সফর ও দু দেশের সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা

মোঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রপতি ডঃ খালতামাজিন বাতুলগা, আমাদের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দের আমন্ত্রণে বর্তমানে পাঁচ দিনের ভারত সফরে এসেছেন। গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম মোঙ্গোলিয়ার কোনও রাষ্ট্রপ্রধান ভারত সফরে এলেন। ডঃ খালতামাজিন বাতুলগা’র সঙ্গে এসেছেন সে দেশের সরকার ও ব্যবসায়িক মহলের একটি উচ্চস্তরীয় প্রতিনিধি দল। 

ভারত সফরে ডঃ বাতুলগা, রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ, উপ রাষ্ট্রপতি এম ভেংকাইয়া নাইডু ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বহু বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন। রাম নাথ কোবিন্দ, সফররত রাষ্ট্রপতির সম্মানে এক ভোজসভার আয়োজন করলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে আলোচ্য বিষয়সূচিতে প্রতিরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপত্তা, পরিকাঠামো, তেজঃশক্তি, বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থাপনা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মত বহু বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ প্রাধান্য পায়। উল্লেখ করা যেতে পারে, গত প্রায় ১৫ দিনের মধ্যে মোঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রপতি ডঃ খালতামাজিন বাতুলগা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বৈঠক করলেন। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে রাশিয়ার ভ্লাডিভোস্টকে আয়োজিত প্রাচ্য অর্থনৈতিক মঞ্চ- EEF’এর পঞ্চম সম্মেলনের অবসরে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, প্রাচ্য দুনিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ বৃদ্ধি করার অঙ্গ হিসেবে ২০১৫ সালে মোঙ্গোলিয়া সফরে যান। ওই সফরে দুটি দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের অভিন্ন আদর্শ ও অভিন্ন বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে মজবুত করার লক্ষ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। 

ভারত ও মোঙ্গোলিয়া ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বরে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। স্থলভাগ পরিবেষ্টিত দেশ হওয়ায় মোঙ্গোলিয়ার মাত্র দুটি প্রতিবেশি দেশ আছে, রাশিয়া ও চীন। কাজেই মোঙ্গোলিয়া, তার ‘তৃতীয় প্রতিবেশি দেশ’ নীতির আওতায় অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। মোঙ্গোলিয়ার বহু মানুষ দুটি দেশের মধ্যে অভিন্ন বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও গভীর সুপ্রাচীন সম্পর্কের কারণে ভারতকে তাদের আধ্যাত্মিক প্রতিবেশি দেশ হিসেবে গণ্য করে। মোঙ্গোলিয়ায় নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত বাকুলা রিমপোচে’কে সে দেশের মানুষ কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করে। বাকুলা রিমপোচে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মোঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রদূত থাকা কালে সে দেশের বহু বৌদ্ধ মঠের সংস্কার সাধন করেন। 

অপার প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ মোঙ্গোলিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রভূত সম্ভাবনা থাকলেও এ পর্যন্ত বাণিজ্যের পরিমাণ আদৌ উল্লেখযোগ্য নয়। ২০১৮-১৯’এ এই পরিমাণ ছিল মাত্র ২ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের মত। তবে বর্তমানে এই পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ পূবের দিকে। এই প্রবণতার সঙ্গে সংগতি রেখে ভারতও এখন কেবল “পূবে সক্রিয় হও” নীতিই নয়, “দূর প্রাচ্যে সক্রিয় হও” নীতি সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ মাসের প্রথম দিকে তাঁর রাশিয়া সফরে এই মর্মে ঘোষণা করেছেন। ভারতের এই নীতি অনুসরণে মোঙ্গোলিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ২০১৫’তে মোঙ্গোলিয়া সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী ওই দেশকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা ঘোষণা করেন, সেই অনুযায়ী, সে দেশে ভারত একটি তেল পরিশোধনাগার প্রকল্প রূপায়ণ করছে। 

মোঙ্গোলিয়া ও ভারত প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক বিষয়ে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে। দেশটি সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন-SCO’তে পর্যবেক্ষক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যে সংগঠনে ভারত ২০১৭ সালে একটি পূর্ণংগ সদস্য দেশের মর্যাদা পেয়েছে। 



ভারত ও মোঙ্গোলিয়া, বিশেষ করে, তেজঃশক্তি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা ক্রমশ মজবুত করছে। দুটি দেশ প্রতিবছর ‘নোমাডিক এলিফ্যান্ট’ শীর্ষক যৌথ মহড়ার আয়োজন করে। বিগত বছরগুলিতে দুটি দেশের মধ্যে জন সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রপতির বর্তমান ভারত সফরে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও মজবুত হয়ে উঠবে বলেই সকল মহলের প্রত্যাশা। (মূল রচনাঃ- ডঃ আতাহার জাফর )

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?